প্রকৃতির বৈরী আচরণ ও তীব্র কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়া দক্ষিণ জনপদের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে টানা ৪৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর অবশেষে আজ মঙ্গলবার রাত থেকে বরিশাল নদীবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। রাত ৯টার দিকে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি বিলাসবহুল লঞ্চ যাত্রী নিয়ে রাজধানীর উদ্দেশ্যে ঘাট ত্যাগ করে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বরিশাল কার্যালয় থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিগত এক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণবঙ্গের নদীপথগুলোতে কুয়াশার তীব্রতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, দৃষ্টিসীমা কয়েক ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা এড়াতে গত রবি ও সোমবার বরিশাল-ঢাকা নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছিল কর্তৃপক্ষ। দুই দিন পর লঞ্চ চলাচল শুরু হলেও যাত্রীদের মনে কাটেনি শঙ্কার মেঘ। সাধারণত বরিশাল থেকে ঢাকা পৌঁছাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগলেও, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় ধীরগতির কারণে এই যাত্রা ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট মাস্টার ও সুকানিরা।
বরিশাল নদীবন্দর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে বরিশাল ঘাট থেকে সরাসরি চারটি এবং ঝালকাঠি থেকে আসা একটিসহ মোট পাঁচটি বড় লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি লঞ্চকে সতর্কতার সাথে এবং আধুনিক রাডার ও ফগ লাইট ব্যবহার করে চলাচলের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা-বরিশাল রুটের বর্তমান নৌযান চলাচলের পরিসংখ্যান
| লঞ্চের নাম | যাত্রার ধরণ | ছাড়ার সময় | গন্তব্যস্থল |
| পারাবত-১১ | সরাসরি | রাত ৯:১০ | ঢাকা (সদরঘাট) |
| পারাবত-১২ | সরাসরি | রাত ৯:২৫ | ঢাকা (সদরঘাট) |
| সুরভী-৭ | সরাসরি | রাত ৯:৪০ | ঢাকা (সদরঘাট) |
| এম খান-৭ | সরাসরি | রাত ৯:৫০ | ঢাকা (সদরঘাট) |
| সুন্দরবন-১২ | ভায়া (ঝালকাঠি হয়ে) | রাত ১০:০০ | ঢাকা (সদরঘাট) |
নদীবন্দরে অপেক্ষায় থাকা যাত্রী আব্দুল মোতালেব জানান, জরুরি প্রয়োজনে ঢাকা যাওয়ার জন্য তিনি গত দুই দিন ধরে অপেক্ষায় ছিলেন। তীব্র শীত ও কুয়াশার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হলেও শেষ পর্যন্ত লঞ্চ চালু হওয়ায় তিনি কিছুটা আশ্বস্ত। তবে মাঝনদীতে কুয়াশা বাড়লে লঞ্চ চরে আটকে পড়া বা দুর্ঘটনা ঘটার ভয় থেকেই যাচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ-এর ট্রাফিক পরিদর্শক জুলফিকার আলী জানিয়েছেন, সদর দপ্তরের নির্দেশনা ও আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে আসায় এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে মাঝপথে দৃশ্যমানতা কমে গেলে নোঙর করে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নদীপথের পাশাপাশি সড়কপথেও কুয়াশার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে বাস ও ট্রাকগুলোকে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে। বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, কুয়াশার কারণে কোনো বাস চলাচল বন্ধ করা হয়নি, তবে চালকদের ফগ লাইট জ্বালিয়ে ও সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহাসড়কে ধীরগতির কারণে গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বেশি সময় লাগছে।
বরিশাল আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত চার দিন ধরে এই অঞ্চলে দুপুর পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলছে না। শৈত্যপ্রবাহের সমতুল্য এই সময়ে বরিশালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। কুয়াশার এই দাপট ও হাড়কাঁপানো শীত আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন। নৌ ও সড়ক পথের এই অচলাবস্থা সাধারণ মানুষের জনজীবনকে স্থবির করে তুলেছে।
