সকালের মেট্রোরেলের ঠাসাঠাসি ভিড়, অফিসফেরত বাসের ক্লান্ত জানালার ধারে বসে থাকা মুহূর্ত, কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় ইউটিউবের প্লেলিস্ট—হঠাৎ ভেসে আসে এক চেনা দীর্ঘশ্বাস:
“ঈশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারত না…”
অথবা, “ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো…”
এই দুটি গান শুধু গান নয়—এ যেন অসংখ্য মানুষের অপ্রকাশিত অনুভূতির ভাষা। নরম সুর, বিষণ্নতার ছায়া আর গভীর কাব্যিক বোধ মিলেমিশে তৈরি করে এক অনির্বচনীয় আবেশ। অজান্তেই শ্রোতা গুনগুন করেন। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই শব্দগুলোর নেপথ্যে থাকা মানুষটি আলোঝলমলে মঞ্চের নন—তিনি নীরব, অন্তর্মুখী এক গীতিকার; নাম সোমেশ্বর অলি।
সোমেশ্বরী নদীর তীর থেকে শব্দের রাজ্যে :
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সোমেশ্বরী নদীর তীরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অলির শৈশব কেটেছে কৃষক পরিবারের সহজ-সরল পরিবেশে। ফজরের নামাজের পর বাবার কোরআন তিলাওয়াত, মায়ের কণ্ঠে সুরেলা উচ্চারণ, আবার পাশের হিন্দু বাড়ির শঙ্খধ্বনি—সব মিলিয়ে এক বহুস্বরের সাংস্কৃতিক আবহেই গড়ে উঠেছে তাঁর শ্রোতাসত্তা। টেলিভিশন ছিল না, রেডিও ছিল নিষিদ্ধ প্রায়; কিন্তু নিষেধ ভেঙেই লুকিয়ে শোনা গান আর দেখা সিনেমা তাঁর মনে বপন করে দেয় শিল্পের বীজ।
কবিতা থেকে সাংবাদিকতা, তারপর গানে প্রত্যাবর্তন :
কলেজে উঠে নেত্রকোনা শহরের পাবলিক লাইব্রেরি হয়ে ওঠে তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। সেখানকার কবি-লেখকদের আড্ডা বদলে দেয় তাঁর চিন্তার জগৎ। কবিতা তখন তাঁর কাছে হয়ে ওঠে আপস না করার ভাষা। সেই কবিতার টানেই ঢাকায় আসা, অনিশ্চিত দিনযাপন, কখনো মিছিল, কখনো বন্ধুর ঘরে রাত কাটানো—সব মিলিয়ে এক সংগ্রামী অধ্যায়।
২০০৭ সালে শুরু হয় সাংবাদিকতা। ‘যায়যায়দিন’, ‘সমকাল’সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রায় এক দশক কাজ করেন তিনি, বিশেষত বিনোদন সাংবাদিকতায়। কিন্তু একসময় উপলব্ধি করেন—সংবাদের ভিড়ে নিজের সৃজনশীলতা হারাচ্ছেন। ২০১৭ সালে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিকতা ছাড়েন, পুরোপুরি গানের কথায় মন দেন।
‘ঘুড়ি’ উড়ল, জন্ম নিল গীতিকার অলি :
গীতিকার হিসেবে অলির উত্থান অনেকটাই আকস্মিক। কবিতার কিছু “বাতিল লাইন” থেকেই শুরু হয়েছিল গানের কথা লেখা। বন্ধু লুৎফর হাসানের সঙ্গে সেই সময়ের ‘কলা–রুটি জেনারেশন’-এর আড্ডায় জন্ম নেয় বহু গান। ২০১১ সালে লুৎফর হাসানের অ্যালবাম ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ প্রকাশের পর বদলে যায় দৃশ্যপট। এই গানই অলিকে পরিচিত করে তোলে বাংলা গানের ভুবনে।
নাটক, ওটিটি ও বড় পর্দার বিস্তার :
‘বড় ছেলে’ নাটকের গান ‘তাই তোমার খেয়াল’, ওয়েব ফিল্ম নেটওয়ার্কের বাইরে-এর ‘রূপকথার জগতে’, কিংবা সিনেমা প্রিয়তমা-র আলোচিত গান ‘ঈশ্বর’—প্রতিটি কাজেই তিনি প্রমাণ করেছেন, গল্প বুঝে গান লেখাই তাঁর শক্তি। ‘ঈশ্বর’ গানটি শুধু তাঁকে বড় পর্দায় প্রতিষ্ঠা দেয়নি, এনে দিয়েছে জাতীয় স্বীকৃতিও।
সোমেশ্বর অলির উল্লেখযোগ্য তথ্য এক নজরে :
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্মস্থান | দুর্গাপুর, নেত্রকোনা |
| পেশা | গীতিকার, কবি |
| উল্লেখযোগ্য গান | ঘুড়ি, ঈশ্বর, তাই তোমার খেয়াল, রূপকথার জগতে |
| প্রথম বড় সাফল্য | ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ (২০১১) |
| পুরস্কার | বিএফডিএ সেরা গীতিকার (২০২৩), সিজেএফবি, ব্লেন্ডার’স চয়েস |
| কবিতার বই | কিছুটা উপর থেকে মানুষ দেখতে ভালো লাগে (২০২৩) |
জনপ্রিয়তার চেয়ে দায়বদ্ধতার গান :
দুই শতাধিক গান লিখেও অলির কাছে জনপ্রিয়তার হিসাব মুখ্য নয়। তিনি বিশ্বাস করেন—শুদ্ধ ভাষা, অর্থবহ শব্দ আর গভীর অনুভূতিই গানকে দীর্ঘজীবী করে। ট্রেন্ডের পেছনে ছোটা নয়, বরং অনুভূতির ওজনই তাঁর লেখার আসল শক্তি।
আজ তাঁর জন্মদিনে হয়তো নেই বড় কোনো আয়োজন। কিন্তু কোথাও না কোথাও কেউ নিশ্চয়ই আবার শুনছে—
“ঈশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারত না…”
আর সেই গানেই নীরবে, অব্যক্ত আলোয়, শ্রোতার হৃদয়ে থেকে যাচ্ছেন সোমেশ্বর অলি।
