জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভ্যন্তরীণ আদর্শিক সংঘাত এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী জোটে এনসিপির অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে নিজেকে দলীয় কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ঘোষণা করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম। রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক দীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে তিনি এই কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম এই নেত্রী মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া এনসিপির জন্মলগ্নের মূল চেতনার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
নুসরাত তাবাসসুম তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, এনসিপি যখন গঠিত হয়েছিল, তখন তা তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং ‘বাংলাদেশপন্থা’র স্বপ্ন বপন করেছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই আদর্শগুলো নিজের রাজনৈতিক দর্শনে ধারণ করেন। কিন্তু দীর্ঘ ১০ মাস পর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষ সমঝোতায় লিপ্ত হওয়া প্রমাণ করে যে, এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকেরা দলের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। বিশেষ করে, যেখানে ৩০০ আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা বারবার দেওয়া হয়েছিল, সেখানে জোট গঠন করাকে তিনি তৃণমূলের সাথে এক প্রকার প্রবঞ্চনা হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এনসিপি যে কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে, তা নুসরাত তাবাসসুমের কাছে অগ্রহণযোগ্য। তিনি মনে করেন, মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের সাথে কোনো আলোচনা না করেই এই জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা দলের ভেতরকার গণতন্ত্রের অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে। এই পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য পার্টির সকল কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
একনজরে নুসরাত তাবাসসুমের রাজনৈতিক অবস্থান ও আপত্তির কারণ
| বিষয়ের ধরণ | বিস্তারিত বিবরণ |
| ব্যক্তির নাম ও পদবি | নুসরাত তাবাসসুম (যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি) |
| বিরোধের মূল কারণ | জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটে অংশগ্রহণ ও আসন সমঝোতা |
| আদর্শিক অভিযোগ | এনসিপির নীতিনির্ধারকদের মূল বক্তব্য থেকে বিচ্যুতি |
| তৃণমূলের ক্ষোভ | ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও প্রবঞ্চনা |
| ঘোষিত সিদ্ধান্ত | নির্বাচনকালীন সময়ে দলের সকল কার্যক্রম থেকে নিজেকে নিষ্ক্রিয়করণ |
| ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা | অবস্থা পুনর্বিবেচনা সাপেক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ |
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নুসরাত তাবাসসুমের মতো একজন প্রভাবশালী নেত্রীর এই নিষ্ক্রিয়তা এনসিপির নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জুলাই বিপ্লবের পর যে তরুণ সমাজ এনসিপিকে ঘিরে নতুন আশার আলো দেখেছিল, এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন তাদের মনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। জামায়াত-এনসিপি জোটের এই সমীকরণ এখন নতুন এক মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে, যেখানে আদর্শের চেয়ে নির্বাচনী কৌশলকেই প্রধান্য দিচ্ছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
নুসরাত তাবাসসুমের এই সাহসী অবস্থান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক সমর্থক তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানালেও, দলের একাংশ মনে করছে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এমন বিভক্তি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল করে দেবে। এখন দেখার বিষয়, এনসিপির আহ্বায়ক কমিটি এই প্রতিবাদকে আমলে নিয়ে কোনো পরিবর্তন আনে কি না।
