সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষ চাকা আবিষ্কার করেছিল কায়িক শ্রম লাঘব করতে, আর আধুনিক যুগে এসে মানুষের চিন্তাশক্তিকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। তবে এআই এখন আর কেবল নিছক সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদমের লড়াই নয়; এটি রূপ নিয়েছে আধুনিক বিশ্বের এক নতুন ‘শীতল যুদ্ধে’। এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর বা উন্নত চিপ তৈরির প্রযুক্তি। পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্য চুরমার করতে চীন বর্তমানে একটি বিশাল এবং অতি-গোপন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি পরিচালনা করছে, যাকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা তৈরির ঐতিহাসিক উদ্যোগের অনুকরণে চীনের নিজস্ব ‘ম্যানহাটন প্রকল্প’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
রয়টার্সের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যখন নেদারল্যান্ডস ও জাপানের মতো মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে চীনের ওপর প্রযুক্তির কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে, বেইজিং তখন গোপনে স্বনির্ভরতার এক মহাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই লড়াইয়ের মূল তুরুপের তাস হলো এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট (EUV) লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি। এই যন্ত্র ছাড়া অত্যাধুনিক এআই মডেল, সুপার কম্পিউটার কিংবা ভবিষ্যতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করা একেবারেই অসম্ভব। বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল (ASML) এই প্রযুক্তির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, যা পশ্চিমা সামরিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হয়।
চিপ উৎপাদনের এই স্নায়ুযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ও কারিগরি চ্যালেঞ্জগুলো নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
বৈশ্বিক চিপ উৎপাদন ও লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির তুলনামূলক চিত্র
| বৈশিষ্ট্য | এএসএমএল (বর্তমান নেতৃত্ব) | চীনের গোপন প্রকল্প (ভবিষ্যৎ লক্ষ্য) |
| যন্ত্রের ওজন ও মূল্য | ১৮০ টন; ২৫ কোটি মার্কিন ডলার। | আকারে আরও বিশাল; রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন। |
| সার্কিট সূক্ষ্মতা | চুলের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ পাতলা। | পরীক্ষামূলক স্তরে বিবর্তনশীল। |
| মূল কারিগরি উৎস | কার্ল জাইস (জার্মানি) অপটিক্যাল লেন্স। | দেশীয় লেজার ও অপটিক্যাল গবেষণা। |
| শ্রমশক্তি | বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশেষজ্ঞ। | এএসএমএলের সাবেক প্রকৌশলী ও দেশীয় তরুণ। |
| রাজনৈতিক প্রভাব | পশ্চিমা জোটের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ। | স্বনির্ভরতা ও ‘গ্রে জোন’ কৌশল। |
| সময়সীমা | বর্তমানে উৎপাদনকারী। | ২০২৮-২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনের লক্ষ্য। |
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ের সমন্বয়ে এই ম্যানহাটন প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শেনঝেনের অত্যন্ত সুরক্ষিত গবেষণাগারে চীনা বিজ্ঞানীরা এমন একটি আলোর উৎস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যা লিথোগ্রাফির জন্য অপরিহার্য। যদিও এই যন্ত্রটি এখনো এএসএমএলের তুলনায় প্রযুক্তিগতভাবে অপরিণত, তবুও এটি পশ্চিমা বিশ্বের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে যে চীন কখনোই এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারবে না। যেখানে এএসএমএলের প্রধান কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন এই পর্যায়ে পৌঁছাতে চীনের কয়েক দশক সময় লাগবে, সেখানে বেইজিং ২০৩০ সালের মধ্যেই এআই চিপ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
প্রযুক্তিগত এই দূরত্ব মেটাতে চীন অত্যন্ত চতুর ও গোপনীয় ‘গ্রে জোন’ কৌশল নিয়েছে। তারা এএসএমএলের দক্ষ প্রকৌশলীদের বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ মার্কিন ডলার বেতনের টোপ দিয়ে নিয়োগ দিচ্ছে এবং নিরাপত্তার খাতিরে তাদের ছদ্মনাম ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। এছাড়া সরাসরি নতুন যন্ত্র কিনতে না পেরে চীন বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিলাম থেকে পুরনো যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করছে। একদল মেধাবী বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ প্রতিটি সূক্ষ্ম অংশ খুলে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সেগুলো পুনরায় জোড়া লাগাচ্ছে, যার প্রতিটি মুহূর্ত ভিডিও করে রাখা হচ্ছে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য।
তবে চীনের সামনে সবচেয়ে বড় পাহাড় সমান বাধা হলো জার্মানির ‘কার্ল জাইস’-এর মতো নির্ভুল অপটিক্যাল আয়না ও লেন্স তৈরি করা। লিথোগ্রাফি প্রক্রিয়ায় প্রতি সেকেন্ডে ৫০ হাজার বার গলিত টিনের ওপর লেজার নিক্ষেপ করে প্লাজমা তৈরি করা এক অতিমানবীয় কারিগরি কাজ। প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, এই এআই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সরবরাহ চেইন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে শতভাগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। চীন যদি এই প্রযুক্তিতে সফলতা পায়, তবে বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা প্রযুক্তিগত একাধিপত্যের চির অবসান ঘটবে এবং ভবিষ্যতের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য চীনের অনুকূলে চলে আসবে।
