জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সক্রিয় ছাত্রনেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানীর শাহবাগ মোড়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে শুরু হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের এই অবস্থান কর্মসূচি গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সংগঠনের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের ঘোষণা করেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত খুনিরা গ্রেপ্তার না হচ্ছে এবং সরকারের উপদেষ্টারা সরাসরি রাজপথে এসে জবাবদিহি না করছেন, ততক্ষণ শাহবাগ থেকে কেউ ঘরে ফিরবে না। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শাহবাগ ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ব্যাপক জনসমাগম ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শহীদ ওসমান হাদি শুধু একজন সংগঠকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। গত ১২ ডিসেম্বর পল্টনের কালভার্ট রোডে দিনদুপুরে রিকশায় থাকা অবস্থায় তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে মোটরসাইকেল আরোহী আততায়ীরা। সিঙ্গাপুরে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই মৃত্যু জাতীয় পর্যায়ে শোকের ছায়া ফেলেছিল, যার প্রতিফলন দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কবি কাজী নজরুল ইসলামের মাজারের পাশে তাঁর দাফন ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের লাখো মানুষের জানাজায়।
আন্দোলনকারীদের এই অবস্থান ও হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের তথ্যসমূহ নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড ও ইনকিলাব মঞ্চের দাবিমালা
| বিষয়বস্তু | বিস্তারিত তথ্য |
| মূল অভিযুক্ত | ফয়সাল করিম মাসুদ (পেশাদার খুনি হিসেবে চিহ্নিত)। |
| বর্তমান অবস্থা | মূল ঘাতক ফয়সাল ভারতে পলাতক; তবে তার বাবা, মা ও স্ত্রী গ্রেপ্তার। |
| আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু | শাহবাগ মোড়, ঢাকা। |
| প্রধান দাবি | খুনিদের পলায়নে সহায়তাকারীদের গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। |
| ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান | উপদেষ্টারা সশরীরে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগ ছাড়বেন না। |
| ভবিষ্যৎ কর্মসূচি | দাবি পূরণ না হলে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ ঘেরাওয়ের হুমকি। |
বিক্ষোভ চলাকালীন শাহবাগ মোড়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের এক আবেগপূর্ণ বক্তব্যে বলেন, “হাদি ভাই বেঁচে থাকতে শীতার্তদের জন্য যে কম্বলগুলো কিনেছিলেন, আজ সেই কম্বল দিয়েই কর্মীরা সারা রাত শাহবাগের রাজপথে অবস্থান করবেন।” তিনি আরও জানান যে, শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কথা মাথায় রেখে পরীক্ষার্থীদের চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে, তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মূল অবরোধ তুলে নেওয়া হবে না। সন্ধ্যায় শহীদ হাদির ভাই শরিফ ওমর বিন হাদি সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, “আমাদের বাধ্য করবেন না যমুনা কিংবা ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল ঘাতক ফয়সাল করিম মাসুদের দেশত্যাগের বিষয়টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের অভিযোগ, সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররাই ঘাতকদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। রাত ১টা ছাড়িয়ে গেলেও শাহবাগে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ছিল রাজপথ। বিক্ষোভকারীরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এটি কেবল একটি সাধারণ আন্দোলন নয়, বরং এটি জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা রক্ষা এবং নতুন বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করার লড়াই।
