স্মরণে চিরজীবন্ত সঙ্গীতশিল্পী জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়

বাংলা গানের আকাশে এমন নক্ষত্রও থাকে, যারা নিঃশব্দে আলো ছড়িয়ে দেন। তবে যখন তারা নিভে যান, তখন সেই আলোর অভাব গভীরভাবে টের পাওয়া যায়। জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ছিলেন ঠিক সেই ধরনের নিভৃতচারী দীপশিখা।

১৯৩৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর চন্দননগরে জন্মগ্রহণ করা এই অসাধারণ সঙ্গীতস্রষ্টা বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের অবদান রেখেছেন। ১৯৬৩ সালে মেগাফোন থেকে প্রকাশিত তাঁর প্রথম রেকর্ডে সুর ও কথায় ছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। এটি ছিল তাঁর সঙ্গীতজীবনের সূচনা। পরের বছর, ১৯৬৪ সালে, সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম। এরপর ধীরে ধীরে মেগাফোন ও এইচএমভি থেকে নিয়মিত প্রকাশ পেতে থাকে তাঁর গান—প্রতিটি গান যেন এক এক অনুভবের দলিল।

বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ, কথা ও সুর এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই সব্যসাচী সঙ্গীতপ্রতিভা—গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। যদিও যতটুকু লিখেছেন ও সুর করেছেন, তার তুলনায় গেয়েছেন কম, তবু গাওয়া গানগুলো আজও কালজয়ী হয়ে আছে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পর যেখানে অনেক সংবেদনশীল ও চিন্তাশীল সঙ্গীতপ্রতিভা হারিয়ে যেতে থাকেন, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ছিলেন তাদের মধ্যে শেষ দীপশিখাগুলোর এক। জনপ্রিয়তার কোলাহল তাঁকে কখনো আকর্ষণ করেছিল না; বরং গভীর অনুভব ও নিখুঁত সুরের সাধনাই ছিল তাঁর মূল পথচলা।

‘বধূয়া আমার চোখে জল এনেছে হায় বিনা কারণে’—এই একটি গানেই যেন লুকিয়ে আছে জীবনের কত না বলা কথা, অগণিত বেদনা। এমন অসংখ্য অমর সৃষ্টির মাধ্যমে আজও তিনি সমানভাবে জীবিত বাঙালির হৃদয়ে। গানকে তিনি শুধু ভালোবাসেননি; গান দিয়েই মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন। রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে বাংলা গানের ভুবনে তিনি দেখিয়েছিলেন নতুন দিশা, এবং গড়ে তুলেছিলেন স্বর্ণযুগের এক অনন্য সেতুবন্ধন।

২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও, তাঁর সৃষ্টি, সুর ও অনুভব চিরকাল বাঙালির স্মৃতিতে, ভালোবাসায় ও নিঃশব্দ শ্রদ্ধায় অমর হয়ে থাকবে। বাংলা গান ও বাঙালির হৃদয়ে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের নাম চিরঅমলিন, চিরঅমর।