কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) খাতে নির্ধারিত ঋণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুতরভাবে পিছিয়ে পড়ায় বাড়তি নজরদারির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ব্যাংকটির দুর্বল অগ্রগতি শুধু তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও পরিকল্পনাগত দক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে তহবিল সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক, কারণ দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রান্তিক উদ্যোক্তা বিকাশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সিএমএসএমই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে সিএমএসএমই খাতে ব্যাংকটি ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাস্তবে বিতরণ হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা, যা মোট লক্ষ্যের মাত্র ১৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থবছরের উল্লেখযোগ্য সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও এমন ধীরগতির অগ্রগতি ব্যাংকটির কার্যকর পরিকল্পনা, মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনার আলোকে এই ঘাটতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। চলতি বছরের ১৭ মার্চ জারি করা এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব তফসিলি ব্যাংককে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর অন্তত ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিনিয়োগের নির্দেশ দেয়। কিন্তু কৃষি ব্যাংক এখনো এই লক্ষ্যের অনেক নিচে অবস্থান করছে। নভেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণের স্থিতি ছিল ৩৫ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে সিএমএসএমই ঋণ ৬ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা—অর্থাৎ মোটের প্রায় ১৯ শতাংশ।
ব্যাংকটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা প্রতিবন্ধকতা এই দুর্বলতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পপণ্যের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এতে অনেক উদ্যোক্তা নতুন ঋণ নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। তার ভাষায়, “বাজারে চাহিদা দুর্বল হলে উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি আর্থিক ঝুঁকি নিতে চান না।”
এ ছাড়া সরকার পরিবর্তনের পর ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বাড়তি যাচাই-বাছাই ও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সুশাসন নিশ্চিত ও ঋণ ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া এসব উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও, এর ফলে ঋণ অনুমোদনে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগছে, যা সামগ্রিক বিতরণ গতি শ্লথ করছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম। ২০২২ সালে চালু হওয়া এবং চলতি বছরের ১২ নভেম্বর পুনরায় মেয়াদ বাড়ানো এই স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলো ২ শতাংশ সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তহবিল নিয়ে উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারে। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় কৃষি ব্যাংক এই স্বল্পসুদে তহবিলের পূর্ণ সুবিধা কাজে লাগাতে পারছে না।
চলতি মাসের শুরুতে এক অভ্যন্তরীণ সভায় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাঞ্চিয়া বিনতে আলী সিএমএসএমই ঋণ বিতরণে দুর্বল অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি সব স্তরের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেন যে, ধারাবাহিক ব্যর্থতা ব্যাংকটির উন্নয়নমূলক দায়িত্ব ও প্রণোদনা সুবিধা—উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যখন সিএমএসএমই খাতকে দেশের অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখছে, তখন কৃষি ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত তার ঋণ কার্যক্রম পুনর্গঠন ও গতিশীল করা। আগামী মাসগুলোতে ব্যাংকটি জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন নীতিনির্ধারক ও বাজার বিশ্লেষকেরা।
