“উন্নয়ন মানে কেবল দারিদ্র্য দূর করা নয়, উন্নয়ন মানে মানুষকে তার সম্ভাবনার পূর্ণতা দিতে সাহায্য করা।” এই বাণীই স্যার ফজলে হাসান আবেদের জীবনের দর্শনকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে। ২৭ এপ্রিল ১৯৩৬ সালে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে জন্মগ্রহণ করেন এই বিশ্বমানবতার নীরব কর্মযোদ্ধা। শৈশব থেকেই মানবিক মূল্যবোধ, দায়বদ্ধতা এবং সহমর্মিতার শিক্ষা তার হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয়। ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন একাধারে স্বপ্নদ্রষ্টা, সমাজসংগঠক এবং কর্মযোগী চিন্তাবিদ।
পাকিস্তান আমলে কর্পোরেট জগতে সফলতার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও দারিদ্র্য তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। সেই অনুভূতির বোধ থেকেই ১৯৭২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্র্যাক (Bangladesh Rural Advancement Committee)। ক্ষুদ্র এক উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া ব্র্যাক আজ বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে স্বীকৃত।
স্যার আবেদের দূরদর্শী নেতৃত্বে ব্র্যাক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, ক্ষুদ্রঋণ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রতিটি স্তরে কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের ভেতরের সম্ভাবনা ও শক্তিকে জাগিয়ে তুললেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। মানুষের জন্য তার এই অনবদ্য নিষ্ঠা এবং প্রতিশ্রুতি ব্র্যাককে শুধু একটি সংস্থা নয়, বরং দারিদ্র্য ও অসাম্য দূরীকরণের একটি শক্তিশালী আন্দোলনে পরিণত করেছে।
২০১৮ সালে স্যার আবেদ ব্র্যাকের চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি নেন এবং সংস্থার ইমেরিটাস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল তার বিশ্বব্যাপী অবদানের প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি অনন্য নিদর্শন। তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পান নাইটহুড উপাধি (Sir), র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, গ্লোবাল সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজসহ বহু রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা।
২০ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে স্যার ফজলে হাসান আবেদ চিরবিদায় নেন। তবে তার আদর্শ, দর্শন এবং মানবকল্যাণের জন্য অদম্য কর্মযজ্ঞ আজও কোটি মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি ক্ষমতার শীর্ষে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। স্যার আবেদের স্মৃতির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা চিরকাল অমলিন থাকবে।