রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও পরিচিত রাজনৈতিক সংগঠক শরিফ ওসমান হাদির মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার ২০ ডিসেম্বর বেলা সোয়া ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ময়নাতদন্ত কার্যক্রম শেষ হয় বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। সব আইনি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীজুড়ে শোক, নীরবতা ও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এর আগে শনিবার সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের হিমঘর থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ওসমান হাদির মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো পথজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। মরদেহ বহনের সময় হাদির পরিবারের সদস্য, সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠজনেরা সঙ্গে ছিলেন। পুরো হাসপাতাল চত্বরে তখন থেকেই এক ধরনের থমথমে ও গম্ভীর পরিবেশ বিরাজ করছিল।
ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ—সবাই প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। অনেকের চোখে অশ্রু, কারও মুখে ছিল চাপা ক্ষোভ ও বেদনাহত নীরবতা। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ গোসল করানো হয় এবং ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এরপর মরদেহ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার দিকে, যেখানে অনুষ্ঠিত হবে তাঁর জানাজা।
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে শনিবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। এ উপলক্ষে দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সব মিশনেও রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার তাঁকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে টানা ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বৃহস্পতিবার ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৫টা ৫০ মিনিটে লাল-সবুজে মোড়ানো কফিনে করে তাঁর মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। আজ জানাজা ও দাফনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এক বলিষ্ঠ, প্রতিবাদী ও স্পষ্টভাষী কণ্ঠস্বরকে চিরবিদায় জানাতে যাচ্ছে।
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু শুধু একজন মানুষের প্রস্থান নয়, এটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে এক গভীর শূন্যতার প্রতীক। তাঁর আদর্শ, সাহসী অবস্থান ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল কণ্ঠ বহু মানুষের মনে দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
