মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বিত আঘাতে পাকিস্তানি সেনারা তখন সম্পূর্ণ দুর্বল ও পলায়নপর অবস্থায়। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক বেতার ভাষণে বলেন, এখন সময় এসেছে শত্রুর বিরুদ্ধে একযোগে আঘাত হানার এবং শেষ আঘাতে তাদের পতন নিশ্চিত করার।
তিনি দেশবাসীকে আহবান জানান, সবভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। একইসঙ্গে শত্রুসৈন্য ও রাজাকারদের অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণের আহবান জানিয়ে বলেন, এভাবেই তারা নিজেদের জীবন রক্ষা করতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী তাঁর ‘৭১ এর দশ মাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সেদিন সকালে আকাশবাণী ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ’র আত্মসমর্পণের আহবান প্রচার করে এবং আকাশে বিভিন্ন ভাষায় লেখা আত্মসমর্পণের লিফলেট ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাতে সতর্ক করা হয় যে চারদিক থেকে সম্মিলিত বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের ঘিরে ফেলেছে।
সেদিন কুমিল্লা হানাদারমুক্ত হয়। পাক সেনারা ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেয়। মুজিবনগর সরকারের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জহুর আহমেদ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট আহমদ আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মানচিত্রখচিত বাংলাদেশের পতাকা উড়তে থাকে কুমিল্লায়।
এ সময় দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে সম্মিলিত বাহিনীর অগ্রযাত্রা চলতে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হিলি, সুনামগঞ্জ, ছাতক, লালমনিরহাট, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, আখাউড়া—এসব স্থানে তীব্র সংঘর্ষ হয়। ঢাকায় মিত্রবাহিনী সামরিক স্থাপনায় ১০ বার বিমান হামলা চালায়।
এর আগের দিন যশোর পতনের পর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজধানীর দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। সেদিন মুক্তিবাহিনীর একটি দল ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত করে আশুগঞ্জের দিকে এগোয়। বরিশাল ও পিরোজপুরও একই দিনে হানাদারমুক্ত হয়।
সিডনি শনবার্গ তাঁর ৮ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে যশোরের মুক্ত পরিবেশ বর্ণনা করেন। পরবর্তীতে তাঁর এসব প্রতিবেদন ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ : নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। তিনি লিখেন, বাসের ছাদে বাঙালিরা নাচছিল, রাস্তায় স্বাধীনতার স্লোগান দিচ্ছিল এবং বিদেশি দেখলে আবেগে হাত চেপে ধরছিল।
মঈদুল হাসান তাঁর ‘মূলধারা ’৭১’ গ্রন্থে লেখেন, ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানের রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। পশ্চিম পাকিস্তানের ছম্ব অঞ্চলে অগ্রগতি থেমে যায়। রাজস্থান-সিন্ধু সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী প্রাধান্য বিস্তার করে। করাচির ওপর অব্যাহত বিমান ও নৌ হামলায় পরিস্থিতি নাজুক হয়ে ওঠে। পূর্বাঞ্চলে পাক সেনারা যশোর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পিছু হটে। কুমিল্লার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং ভারত-বাংলাদেশ বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। তবে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার চারদিকে অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারবে কি না, তা তখনো স্পষ্ট ছিল না।
সেদিন পাকিস্তান সরকার মনোনীত উপপ্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে যোগ দিতে নিউইয়র্কে রওনা দেন।
অন্যদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভারতীয় প্রতিনিধি সমর সেন বলেন, পাকিস্তানকে অবশ্যই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং উপমহাদেশে শান্তি ফিরে পেতে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাবই কার্যকর হবে না।
জিলাইভ২৪/এসএস