২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ কত দূরে? ক্যালেন্ডারে দেখলে প্রায় তিন বছর। কিন্তু ক্রিকেটে তিন বছর মানেই এক পুরো প্রজন্মের পরিবর্তন। সেই সময়ে নতুন ক্রিকেটার উঠে আসবে, দলীয় পরিকল্পনা বদলাবে, কৌশল পাল্টাবে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে এখনো যেটা বদলায়নি, তা হলো—রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির প্রতি অগাধ নির্ভরতা।
রাঁচির প্রথম ওয়ানডে সেই নির্ভরতার আরেকটি দৃশ্যপট। যেন পুরোনো কোনো পরিচিত দৃশ্য আবার সামনে ফুটে উঠেছে—রোহিতের দাপট, কোহলির নৈপুণ্য, এবং তাঁদের জুটির ওপর ভর করে ভারতের আধিপত্য। এই স্থিতিশীলতার কারণেই হয়তো সাবেক অধিনায়ক ক্রিস শ্রীকান্ত তাঁর মূল্যায়নে এতটা সরাসরি হয়েছেন।
শুরুতেই আসা যাক রোহিত শর্মার দিকে। বয়স ৩৭, কিন্তু ব্যাটিংয়ে কোনো ক্লান্তির চিহ্ন নেই। রাঁচির ৫৭ রানের ইনিংসে তিনি যেন দেখিয়ে দিলেন, তাঁর হাতে এখনও সেই পুরনো স্বাচ্ছন্দ্য, সেই সময়জ্ঞান, আর সবচেয়ে বড় কথা—সেই বিস্ফোরকতা। তিনটি ছক্কায় ভেসে গেছে রাঁচি স্টেডিয়াম, আর শেষ ছক্কার সঙ্গে বদলে গেছে ইতিহাস। ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ছক্কার মালিক এখন তিনি। আফ্রিদির দীর্ঘমেয়াদি রেকর্ড যে মুহূর্তে ভাঙলেন, সেই মুহূর্তটা যেন ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন মাইলফলক।
এখন আসা যাক বিরাট কোহলির দিকে। ১২০ বলে ১৩৫ রান—একটি ইনিংস, যা শুধু বড় স্কোর নয়; এটি ছিল ক্রিকেটীয় শুদ্ধতার উদাহরণ। তাঁর ১১টি চার এবং ৭টি ছক্কা প্রমাণ করেছে—তিনি এখনও সেই আগের মতোই ক্ষুধার্ত, মনোযোগী এবং ফিট। ৫২তম সেঞ্চুরি তাঁকে আবারও দাঁড় করিয়েছে ওয়ানডে ইতিহাসের সেরাদের সারিতে।
এই দুই ইনিংস একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে ভারতের ১৩৬ রানের বিশাল জুটি। এই জুটিই খেলার গতিপথ বদলে দিয়েছে। এবং এখানেই ক্রিস শ্রীকান্তের মন্তব্যের জন্ম। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে তিনি বলেন—
“রোহিত বাম পাশে, কোহলি ডান পাশে। এদের ছাড়া পরিকল্পনা কাজ করতে পারে না। ভারত ২০২৭ বিশ্বকাপ জিতবে না ওদের ছাড়া।”
এই মন্তব্য হয়তো অনেকের কাছে অতিরঞ্জন মনে হতে পারে, কিন্তু শ্রীকান্ত যে প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, তা বিশ্লেষণ করলে তাঁর যুক্তি পরিষ্কার হয়। তাঁর মতে, ভারতীয় দলের বর্তমান কাঠামো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—দুটোরই মূল ভিত্তি রোহিত–কোহলি।
Table of Contents
১. ব্যাটিং অর্ডারের স্থিতিশীলতা
ওপেনিংয়ে রোহিতের উপস্থিতি এবং তিন নম্বরে কোহলির নোঙর—এই দুই জায়গা ভারতীয় ব্যাটিংকে দেয় কৌশলগত স্থিরতা। তাঁদের জায়গায় নতুন কাউকে আনা মানে আবার শূন্য থেকে শুরু করা।
২. পাওয়ার প্লে ও মাঝের ওভারের নিয়ন্ত্রণ
রোহিত পাওয়ার প্লেতে রান তুলতে বিশ্বের সেরাদের একজন।
কোহলি মাঝের ওভারে স্ট্রাইক রোটেশন ও সিঙ্গেল–ডাবল নেওয়ার শিল্পের ওস্তাদ।
৩. বড় ম্যাচ অভিজ্ঞতা
বিশ্বকাপে চাপ কতটা তীব্র—তা ভারত, পাকিস্তান বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের খেলোয়াড়রা ভালোই জানেন। শ্রীকান্ত মনে করেন, বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বড় অস্ত্র। রোহিত–কোহলি ঠিক সেটাই এনে দেন।
৪. দক্ষিণ আফ্রিকা–জিম্বাবুয়ে–নামিবিয়ার কন্ডিশনে তাঁদের দক্ষতা
২০২৭ বিশ্বকাপের ভেন্যু বাউন্সি উইকেটের জন্য খ্যাত। সেখানে শট সিলেকশন, পুল–হুক খেলার দক্ষতা এবং বাউন্স নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিত–কোহলি—দু’জনই এই ক্ষেত্রে দারুণ দক্ষ।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—তাঁরা কি ২০২৭ সালেও একই ফিটনেস ধরে রাখতে পারবেন? শ্রীকান্তের মতে পারবেন। তিনি বলেন,
“ওরা এখন শুধু ওয়ানডে খেলছে। কিন্তু তবুও যে মানসিকতা নিয়ে ফিটনেস ধরে রেখেছে, তা অসাধারণ।”
সমালোচকরাও স্বীকার করবেন, রাঁচির ম্যাচে তাঁদের ব্যাটিং দেখে মনে হয়নি তাঁরা ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে। বরং তাঁদের ব্যাটিং ছিল পরিণত, ধারালো এবং দলে তাঁদের প্রয়োজনীয়তার স্পষ্ট স্মারক।
সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায়—শ্রীকান্তের মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করলেও তাঁর বক্তব্য শূন্য নয়। ভারতের বর্তমান পরিকল্পনায় রোহিত–কোহলি এখনও মূল কেন্দ্রবিন্দু। তাঁরা যে শুধু সিনিয়র নন, এখনও প্রভাবশালী—রাঁচির ম্যাচ সেটাই আবার প্রমাণ করেছে।
