সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু: বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

বাংলা সাহিত্যজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সমালোচক ও সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু—আধুনিক কবিতা ও সাহিত্যচিন্তায় যাঁর অবদান অনন্য ও অসামান্য।

১৯০৮ সালের ৩০ নভেম্বর কুমিল্লায় তাঁর জন্ম। পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুর পরগনার মালখানগর। জন্মের অল্প সময় পরই ধনুষ্টংকারে মাকে হারান তিনি। পরে বাবা পরিব্রজ্যা গ্রহণ করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে তাঁর লালন-পালন হয় মাতুলালয়ে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ঢাকার পরিমণ্ডলে, যা তাঁর সৃজনশীলতা ও বোধকে গভীরভাবে সমৃদ্ধ করে।

শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯২৫ সালে ম্যাট্রিক, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯২৭ সালে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩০ সালে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ ও পরের বছর এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন—সবক্ষেত্রেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে।

কর্মজীবন শুরু হয় কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় (১৯৪৪–১৯৫১) সাংবাদিকতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করে। পরে আমেরিকার পেনসিলভানিয়া কলেজ ফর উইমেন্স, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রুকলিন কলেজ, কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামার স্কুলসহ নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার সুযোগ পান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শরৎ বক্তৃতামালা’ (১৯৬১) তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক কৃতিত্বের স্বীকৃতি বহন করে।

সম্পাদক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘প্রগতি’ এবং কলকাতা থেকে ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত প্রকাশিত ‘কবিতা’ পত্রিকা—বাংলা কবিতার নবযুগ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘কবিতা’ পত্রিকা রবীন্দ্রোত্তর কবিতা আন্দোলনে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। বুদ্ধদেব নিজেও ধীরে ধীরে রবীন্দ্র প্রভাব থেকে সরে এসে আধুনিকতার নিজস্ব ধারায় উত্তরণ ঘটান।

কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সমালোচনা—বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তিনি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন। প্রথমদিকে রোমান্টিকতা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখায় মননশীলতার প্রভাব গভীর হয়। তাঁর গদ্যে ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর ও চিন্তার সূক্ষ্মতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা বুদ্ধদেব বসু শিশুদের জন্যও লিখেছেন। ইংরেজিতে রচিত তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ ইউরোপ-আমেরিকায়ও প্রশংসিত হয়েছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
– ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী’ নাটকের জন্য ১৯৬৭ সালে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার
– ১৯৭০ সালে ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ’
– ‘স্বাগত বিদায়’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৭৪ সালে মরণোত্তর ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’

ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুসাহিত্যিক প্রতিভা বসুর সঙ্গে—যিনি তাঁর সাহিত্যযাত্রার ঘনিষ্ঠ সহচরী।

১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ কলকাতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তাঁর রেখে যাওয়া আলোর রেখা আজও সমান উজ্জ্বল।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এসএস