দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিন: মানবতা ও ত্যাগের এক অমর উপাখ্যান

উপমহাদেশের ইতিহাসে দানশীলতা ও ত্যাগের মহিমায় যাঁর নাম সর্বপ্রথম উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন কালজয়ী ব্যক্তিত্ব হাজী মুহাম্মদ মহসিন। ১৭৩২ সালের ৩ জানুয়ারি হুগলিতে জন্ম নেওয়া এই মহান মনীষী তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন আর্তমানবতার সেবায়। তাঁর অসামান্য দানশীলতা তাঁকে কেবল এক সমৃদ্ধ জমিদার হিসেবে নয়, বরং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ‘দানবীর’ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।

হাজী মুহাম্মদ মহসিনের পিতা হাজী ফয়জুল্লাহ ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনী জায়গিরদার। অন্যদিকে তাঁর মা জয়নব খানমের যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় ছিল সুবিস্তীর্ণ ভূসম্পত্তি। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে এবং পরবর্তীতে বোন মন্নুজানের মৃত্যুর পর তিনি এক বিশাল সম্পত্তির মালিক হন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, অঢেল সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মহসিন ছিলেন এক বিরল ব্যতিক্রম। রাজকীয় জাঁকজমকপূর্ণ জীবন পরিহার করে তিনি হুগলি ইমামবাড়ার পাশের এক সাধারণ কুটিরে বাস করতেন। তিনি নিজের খাবার নিজ হাতে রান্না করতেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসে আহার করতেন। এমনকি জীবনধারণের খরচ জোগাতে তিনি নিজ হাতে পবিত্র কুরআন শরীফ নকল করে তা বিক্রির অর্থ ব্যবহার করতেন।

জ্ঞানার্জন ও আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য তিনি প্রায় ২৭ বছর মক্কা, মদিনা, কারবালা, ইরান ও তুরস্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। দেশে ফিরে ১৭৬৯-৭০ সালের ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় তিনি অসংখ্য লঙ্গরখানা স্থাপন করে ক্ষুধার্ত মানুষকে অকাতরে অন্নদান করেন। ১৮০৬ সালে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি জনকল্যাণে উৎসর্গ করে গঠন করেন ঐতিহাসিক ‘মহসিন ফান্ড’। এই ফান্ডের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হুগলি মহসিন কলেজ, চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হল এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি বিএনএস হাজী মহসিন তাঁর স্মৃতি অম্লান করে রেখেছে। ১৮১২ সালের ২৯ নভেম্বর এই মহতী দানবীর পরলোকগমন করলেও তাঁর নিঃস্বার্থ পরোপকারের আদর্শ আজও বাঙালির হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

জিলাইভ/টিএসএন