রূপগঞ্জে ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ড কাঁপনে বদলে গেল একটি পরিবারের ভাগ্য। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে যখন ভূমিকম্পে ভূমি কেঁপে ওঠে, তখন তিন বছরের বড় মেয়ে নুজাইবার কাছে যাওয়ার তাড়ায় ১০ মাসের ফাতেমাকে কোলে নিয়েছিলেন কুলসুম বেগম। কিন্তু ঘর থেকে বেরোতেই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুফাঁদ অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য।
সড়কের পাশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় থাকা একটি সীমানাপ্রাচীর হঠাৎ ধসে পড়ে কুলসুম, তাঁর কোলে থাকা ফাতেমা এবং প্রতিবেশী জেসমিন বেগমের ওপর। মুহূর্তেই থমকে যায় সবকিছু। স্থানীয়রা ছুটে এসে ইট সরিয়ে ফাতেমার নিথর দেহ উদ্ধার করেন। মাত্র দশ মাসের ছোট্ট শিশুটি ঘটনাস্থলেই মারা যায়—মায়ের কোলে।
সংজ্ঞাহীন অবস্থায় থাকা কুলসুমকে দ্রুত উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এখানেই শুরু হয় আরেক শোকের অধ্যায়। রূপগঞ্জের ইউএস–বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাঁকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেলে। সেখান থেকে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট, পরে নিউরো সায়েন্সেস—কিন্তু কোথাও একটি শয্যাও মিলল না। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে হলো ঢাকার শ্যামবাজারে স্বামীর ভাড়া বাসায়। স্বজনদের অভিযোগ—৯ ঘণ্টা ঘুরেও পেলেন না কোনো উন্নত চিকিৎসা।
এদিকে আবদুল হক ঢাকার হাসপাতালে ছুটছিলেন স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য। আর সেই সময়েই রূপগঞ্জে দাফন সম্পন্ন হয় তাঁর ছোট মেয়ে ফাতেমার। অসুস্থ স্ত্রীকে ছেড়ে গ্রামে যেতে পারেননি, আর মেয়ের দাফনও দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর। বিকেলে মা-বাবাহীন অবস্থায় দাফন হয় শিশুটি।
স্বজনরা জানাচ্ছেন, খুব সাধারণ ও সুখী ছিল তাঁদের সংসার। দুই শিশুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন তাঁরা। মেয়েদের মাদ্রাসায় ভর্তি করানোরও পরিকল্পনা ছিল। শুক্রবারের ভূমিকম্প সেই স্বপ্নগুলো ভেঙে দিল চূর্ণবিচূর্ণ করে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, যে প্রাচীরটি ধসে পড়েছে সেখানে কোনো রড বা পিলার ছিল না। এ ধরনের অবহেলা একটি প্রাণহানি ঘটিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। নিহত শিশুর দাফনের খরচ হিসেবে পরিবারকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
স্থানীয় ইমতিয়াজ রনি বলেন, “ফাতেমাকে আমরা ইটের নিচ থেকে তুলেছি। কুলসুম তখন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। তাঁর কাছে এখনো সন্তানের মৃত্যুর খবর বলা হয়নি।”
পরিবারটির ওপর আঘাত নেমে এসেছে দুই দিক থেকে—একদিকে সন্তানের মৃত্যু, অন্যদিকে গুরুতর আহত মায়ের অনিশ্চিত চিকিৎসা। এখন সকলের একটাই প্রার্থনা—কুলসুম যেন সুস্থ হয়ে অন্তত সত্যিটা মানতে পারেন আর পরিবারটি যেন নতুন করে দাঁড়াতে পারে।
