রংপুরে মৃত রোগীকে আইসিইউতে রাখার অভিযোগ: হাসপাতালে চরম উত্তেজনা
রংপুর নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত রোগীকে ‘জীবিত’ দেখিয়ে আইসিইউতে (ICU) রেখে চিকিৎসার নাটক সাজানোর অভিযোগে এক চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নীলফামারীর ডোমার থেকে আসা এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রংপুরের কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বজনদের বিক্ষোভ এবং হাসপাতাল কর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাটি চিকিৎসা সেবার নৈতিকতা এবং বেসরকারি হাসপাতালের বাণিজ্যিক মানসিকতা নিয়ে আবারও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
Table of Contents
ঘটনার সূত্রপাত ও পরিবারের অভিযোগ
নিহত মকসেদ আলী (৫০) নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বমুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা। গত ৫ নভেম্বর তিনি হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। পরিবারের ভাষ্যমতে:
অপ্রাপ্তবয়স্কের স্বাক্ষর: ৬ নভেম্বর বিকেলে এনজিওগ্রাম চলাকালে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে চিকিৎসক তড়িঘড়ি করে মকসেদ আলীর অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলের কাছ থেকে একটি বন্ডে স্বাক্ষর নিয়ে রিং পরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন।
মৃত্যু গোপন করার চেষ্টা: স্বজনদের দাবি, অপারেশন থিয়েটারেই (OT) মকসেদ আলীর মৃত্যু হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মোটা অংকের বিল আদায়ের উদ্দেশ্যে তাকে মৃত ঘোষণা না করে কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস সচল দেখিয়ে আইসিইউতে স্থানান্তর করে।
ফেসবুক লাইভ ও হাতাহাতি: সন্দেহ দানা বাঁধলে স্বজনরা জোরপূর্বক আইসিইউতে প্রবেশ করেন এবং রোগীকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। এই খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। হাসপাতাল কর্মচারীরা বাধা দিতে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক হাতাহাতি হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাফাই
হাসপাতালের পরিচালক মিরাজুল মহসিন সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন যে, এনজিওগ্রামের সময় রোগীর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। তাঁর দাবি:
“রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল। তিনি আইসিইউতেই মারা গেছেন। কিন্তু স্বজনরা ভেতরে ঢুকে ফেসবুক লাইভ করে অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছিলেন, তাই কর্মচারীরা তাদের বাধা দিয়েছে।”
ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র
নিচে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মূল বিষয়গুলো সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহত রোগী | মকসেদ আলী (৫০), ডোমার, নীলফামারী। |
| হাসপাতালের নাম | কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর। |
| চিকিৎসকের নাম | ডা. আবু জাহিদ বসুনিয়া। |
| অভিযোগের ধরন | মৃত রোগীকে আইসিইউতে রেখে ব্যবসার চেষ্টা ও চিকিৎসায় অবহেলা। |
| উত্তেজনার কারণ | আইসিইউতে স্বজনদের প্রবেশে বাধা ও কর্মচারীদের সঙ্গে হাতাহাতি। |
| বর্তমান অবস্থা | এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে, পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। |
জনমনে প্রতিক্রিয়া ও আইনি প্রেক্ষাপট
এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর রংপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, অনেক বেসরকারি হাসপাতালই মৃত্যুর পরও লাইফ সাপোর্টের নামে বাণিজ্য চালিয়ে থাকে, যা একটি বড় সামাজিক ব্যাধি। অন্যদিকে, চিকিৎসকদের মতে, অনেক সময় মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে আইসিইউতে রাখা হয়, যাকে সাধারণ মানুষ ভুল বুঝতে পারে।
তবে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বন্ডে স্বাক্ষর নেওয়া আইনগতভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে নিহতের পরিবার বিচার দাবি করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে।
পরবর্তী করণীয় ও সতর্কতা
এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রোগীদের পরিবারের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
যেকোনো বড় অস্ত্রোপচারের আগে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের দ্বিতীয় মতামত (Second Opinion) নেওয়া।
অপারেশন বা আইসিইউ বন্ডে স্বাক্ষর করার আগে ভালো করে পড়ে নেওয়া এবং স্বাক্ষরকারী যেন অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক ও আইনগত অভিভাবক হন তা নিশ্চিত করা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো বিবাদ হলে নিজেরা আইন হাতে না তুলে পুলিশ বা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে অভিযোগ জানানো।
পরিশেষে বলা যায়, মকসেদ আলীর মৃত্যু এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের একটি সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি বা ব্যবসায়িক অসততা প্রমাণিত হয়, তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত যাতে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা না হারায়।
