সরকারি চাল আত্মসাৎ মামলায় যুবদল নেতা গ্রেফতার

কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল আত্মসাতের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় দেলোয়ার হোসেন (৩২) নামে এক যুবদল নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত বুধবার (৫ নভেম্বর) বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে ইটনা উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে থেকে তাকে আটক করা হয়। আটককৃত দেলোয়ার হোসেন ইটনা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও চাল পাচারের অভিযোগ

গ্রেফতারকৃত দেলোয়ার হোসেন উপজেলার মৃগা ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির অনুমোদিত ডিলার জানু মিয়ার ছেলে। পুলিশ ও মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর এক চাঞ্চল্যকর চাল পাচারের ঘটনা সংঘটিত হয়। ওইদিন ডিলার জানু মিয়ার বরাদ্দকৃত চাল সরকারি গুদাম থেকে তুলে সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণ না করে কালোবাজারে বিক্রির অশুভ উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী তাড়াইল উপজেলায় পাচার করা হচ্ছিল।

একটি বিশেষ ট্রলারে করে মোট ৭২ বস্তা সরকারি চাল নদীপথে নেওয়ার সময় স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় পুলিশ তাড়াইল উপজেলায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে হাতেনাতে আটক করে। সেই অভিযানে জব্দকৃত চালের বস্তাগুলোতে সরকারি সিলমোহরযুক্ত খাদ্য বিভাগের ছাপ ছিল। এই ঘটনার পর পুরো উপজেলায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং দরিদ্রদের হক আত্মসাতের প্রতিবাদে স্থানীয়রা সোচ্চার হয়ে ওঠেন।

মামলার বিবরণ ও আইনি পদক্ষেপ

চাল চুরির এই ঘটনায় সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. বাবুল আকরাম বাদী হয়ে ইটনা থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান ডিলার জানু মিয়া এবং তার সহযোগী হিসেবে ছেলে দেলোয়ার হোসেনসহ মোট আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়। মামলার পর থেকেই দেলোয়ার ও তার বাবা গ্রেফতার এড়াতে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান।

দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ইটনা থানা পুলিশ জানতে পারে যে, দেলোয়ার হোসেন জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা পরিষদ এলাকায় অবস্থান করছেন। তাৎক্ষণিক অভিযানে উপপরিদর্শক (এসআই) আনিছুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।


মামলার অগ্রগতি ও আসামিদের বর্তমান অবস্থা

মামলার বর্তমান পরিস্থিতি এবং আসামিদের গ্রেফতার সংক্রান্ত তথ্য নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
মামলার বাদীমো. বাবুল আকরাম (উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক)
প্রধান আসামিজানু মিয়া (ডিলার, মৃগা ইউনিয়ন)
গ্রেফতারকৃত আসামিদেলোয়ার হোসেন (যুগ্ম আহ্বায়ক, উপজেলা যুবদল)
জব্দকৃত আলামত৭২ বস্তা সরকারি চাল ও একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার
মামলা দায়েরের তারিখ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
মোট আসামির সংখ্যা০৮ জন
বর্তমানে গ্রেফতারকৃত০৪ জন (বাকি ৪ জন পলাতক)

পুলিশের বক্তব্য ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

ইটনা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত দেলোয়ার হোসেনকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা মামলার বাকি চার পলাতক আসামিকে গ্রেফতার করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। সরকারি চাল আত্মসাতের মতো স্পর্শকাতর মামলায় কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

এদিকে, একজন রাজনৈতিক নেতার এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জনগণের মৌলিক অধিকার ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে দাবি উঠেছে, তার মাঝে একজন জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক পদের অধিকারীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয় হিসেবেই দেখছেন সচেতন মহল। দরিদ্র মানুষের চাল চুরি করে যারা পাচারের সাথে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন মৃগা ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

উল্লেখ্য যে, এর আগে এই মামলার সাথে জড়িত আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। প্রধান আসামি ডিলার জানু মিয়া এখনও পলাতক থাকায় এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকেও খুব দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।