মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) খামা প্রেস এজেন্সির এক প্রতিবেদনে সাদিকের পরিবারের এই কঠিন জীবনসংগ্রামের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এত বেশি যে প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সন্তানদের দেখাশোনা করাও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
Table of Contents
গাড়ি বিক্রির কমিশনেই চলে বিশাল সংসার
সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি গাড়ি বিক্রি হলে তিনি প্রায় এক হাজার আফগানি আয় করেন। এই আয় দিয়ে এতজনের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিবারের খরচ জোগাতে তাঁর কয়েকজন সন্তানকেও কাজ করতে হয়। তাদের কেউ কেউ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাগজ ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে। ফলে পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় শিশুদেরও শ্রম দিতে হচ্ছে।
পরিবারে সাধারণত দিনে দুই বেলা খাবার রান্না করা হয়—সকালের নাশতা ও রাতের খাবার। সাদিকের দুই স্ত্রী রান্নার দায়িত্ব পালন করেন। শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে বসে খাবার খান। গ্রীষ্মকালে তাঁদের জমায়েত হয় উঠানে।
কিন্তু এত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না সব সময়। দারিদ্র্যের কারণে পরিবারের কিছু শিশুকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটাতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি কম্বলে ঘুমান ছয়-সাতজন
পরিবারটির বাসস্থানের অবস্থাও বেশ নাজুক। ঘুমানোর পর্যাপ্ত জায়গা ও বিছানার অভাবে কখনো কখনো ছয় থেকে সাতজনকে একটি পাতলা কম্বল ভাগাভাগি করে ঘুমাতে হয়।
বাড়ির ঘরগুলোতে প্রচলিত দরজা-জানালার ব্যবস্থা নেই। দরজার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় পাতলা পর্দা। গোসলের জায়গাটিই কাপড় ও থালাবাসন ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। কখনো কখনো সেই জায়গা শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহার করতে হয়।
এ ধরনের পরিবেশে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন। বিশেষ করে পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার ও নিরাপদ পরিবেশের অভাব শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নিজের সন্তানদের নাম মনে রাখাও কঠিন
সাদিকের পরিবার এত বড় যে সব সন্তানের নাম মনে রাখাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কখনো পরিবারের সবাইকে নিয়ে খাবার খাওয়ার সময় তিনি সন্তানদের গুনে দেখেন। তখন বুঝতে পারেন, কেউ একজন সেখানে নেই। পরে জানা যায়, সে অন্য কোথাও রয়েছে।
অনেক সময় সন্তানের নাম মনে করতে না পেরে তিনি তাঁদের ‘আমার ছেলে’ বা ‘আমার সন্তান’ বলে ডাকেন। একবার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে এক ধর্মীয় নেতার কাছে ভুল করে এক মেয়ের পরিবর্তে অন্য মেয়ের নাম বলে ফেলেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এত বড় পরিবার গড়ে তোলার পেছনে সাদিকের ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি বেশি সন্তান নিতে চেয়েছিলেন। তবে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ভরণপোষণের বাস্তব চ্যালেঞ্জও বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের পর বছর সাদিক ও তাঁর স্ত্রীরা ১৪ সন্তানকে হারিয়েছেন। সন্তান হারানোর এই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বর্তমানে জীবিত সন্তানদের খাবার, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের চাপও তাঁকে সামলাতে হচ্ছে।
অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে উদ্বেগ
সাদিকের প্রথম বিয়ে হয়েছিল যখন তাঁর বয়স ছিল ২০ বছর। তিনি জানান, প্রতিটি বিয়ের আগে কনের দেনমোহর বা বিয়েসংক্রান্ত অর্থ জোগাড় করতে তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চয় করতে হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাদিকের চার স্ত্রী যখন তাঁকে বিয়ে করেন, তখন তাঁদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। এই তথ্য অল্প বয়সে বিয়ে এবং কৈশোরে মাতৃত্বের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কৈশোরে বিয়ে হলে মেয়েদের পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যগত জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
একইভাবে, বারবার গর্ভধারণ নারীর শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত চিকিৎসা এবং প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা না থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এসব সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তবে সাদিকের স্ত্রীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁদের স্বাস্থ্য নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সন্তানদের শিক্ষিত করার স্বপ্ন
সাদিক নিজে পড়তে বা লিখতে পারেন না। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু শিক্ষার খরচ বহন করা তাঁর জন্য এখনো বড় বাধা।
একটি শিশুর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বই, খাতা, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের দরকার হয়। এত বিপুলসংখ্যক সন্তানের ক্ষেত্রে এসব ব্যয় বহন করা আরও কঠিন। পরিবারের আয় যখন খাবারের চাহিদা মেটানোর জন্যই যথেষ্ট নয়, তখন শিক্ষার ব্যয় জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে সন্তানদের কাজে যুক্ত হতে হলে তাদের নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সহায়তা চেয়েছেন সরকার ও ত্রাণ সংস্থার কাছে
পরিবারের ভরণপোষণে সহায়তা পেতে আফগান সরকারের পাশাপাশি ত্রাণ সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন সাদিক। তাঁর প্রধান চাওয়া দুটি—সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা এবং তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।
সাদিকের পরিবারের পরিস্থিতি দারিদ্র্যের কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাওয়া মানুষের বাস্তবতা তুলে ধরে। পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা।
এই পরিবারের সংকট মোকাবিলায় খাদ্যসহায়তা, শিক্ষার ব্যয় বহনে সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি শিশুদের শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
সাদিকের বয়স এখন ৫৭ বছর। এত বড় পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তাঁর প্রতিদিনের জীবন কাটছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। সন্তানদের সবার জন্য পর্যাপ্ত খাবার এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার যে স্বপ্ন তিনি দেখেন, তা পূরণ করতে এখন বাইরের সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।








