অমর একুশে বইমেলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা রক্ষার দাবিতে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এক ‘প্রতীকী বইমেলা’ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে মূল বইমেলার তারিখ পিছিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করার প্রতিবাদে ‘একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ’ এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলা একাডেমির কবি আল মাহমুদ লেখক কর্নারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
তারিখ পরিবর্তনের বিতর্ক ও ক্ষোভের কারণ
সাধারণত প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা শুরু হলেও এবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত মেলার সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। আয়োজকদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং একুশের চেতনার পরিপন্থী। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মফিজুর রহমান বলেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিকর্মীদের চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। মূলত নির্বাচনের দোহাই দিয়ে মেলার সময় পরিবর্তন করা হলেও অংশীজনদের সাথে কোনো আলোচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
নিচে প্রতীকী বইমেলা এবং মূল মেলার সময়সূচির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ সংক্রান্ত তথ্যাবলি
| বিষয়ের বিবরণ | প্রতীকী বইমেলা | মূল অমর একুশে বইমেলা (সরকার ঘোষিত) |
| উদ্বোধনের তারিখ | ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ |
| উদ্বোধক | ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী | নির্ধারিত হয়নি |
| স্থান | বাংলা একাডেমি চত্বর | বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান |
| আয়োজক | একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ | বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় |
| অংশগ্রহণকারী | ৫০টিরও বেশি প্রকাশনা সংস্থা | প্রায় সকল তালিকাভুক্ত প্রকাশনী |
| প্রধান বৈশিষ্ট্য | সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ ও প্রতীকী মেলা | জাতীয় বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব |
প্রতীকী মেলার কর্মসূচি ও প্রস্তুতি
সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এই প্রতীকী মেলার উদ্বোধন করবেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০টি প্রকাশনা সংস্থা এই মেলায় অংশ নিতে সম্মতি জানিয়েছে এবং এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এটি একটি প্রতিবাদী আয়োজন, তবে এর সাথে বাংলা একাডেমির সরাসরি কোনো বিরোধিতা নেই বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে। আয়োজকরা স্পষ্ট করেছেন যে, তারা ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মূল মেলাতেও অংশগ্রহণ করবেন।
১ ফেব্রুয়ারির এই প্রতীকী মেলায় বই প্রদর্শনী ছাড়াও দিনভর চলবে গান, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ও আলোচনা সভা। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এই আয়োজনে সংহতি প্রকাশ করেছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রকাশক সাঈদ বারী, জামসেদ আনোয়ার, আলমগীর শিকদার এবং বিশিষ্ট লেখক কামরুজ্জামান ভূঁইয়া। তাদের মতে, বইমেলা কেবল একটি কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব; তাই এর ঐতিহ্যগত তারিখ কোনোভাবেই পরিবর্তন করা উচিত নয়।
অংশীজনদের দাবি ও আগামীর প্রত্যাশা
সংগ্রাম পরিষদের অভিযোগ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সাথে পরামর্শ না করেই তারিখ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের কাছে কাম্য ছিল না। তারা মনে করেন, ১ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু করে নির্বাচনের দিনগুলোতে মেলা বন্ধ রাখাই ছিল যৌক্তিক সমাধান। প্রাণের টানে এবং ভাষার মাসের প্রথম দিনের আবেগ ধরে রাখতে আগামী শনিবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সর্বস্তরের মানুষের বিপুল সমাগম ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আয়োজকবৃন্দ।
