ছায়ানটের একুশে উদযাপন: সঙ্গীত, কবিতা ও প্রজাতান্ত্রিক শ্রদ্ধা

ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত ছায়ানট সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অডিটোরিয়ামে শনিবার সকাল ১০:৩০ ঘটিকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি একটি মার্জিত ও প্রাণবন্ত পরিবেশে সম্পন্ন হলো। এই বিশেষ আয়োজন সঙ্গীত, কবিতা ও স্মৃতিচারণের মাধ্যমে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গর্বমিশ্রিত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করল।

ছায়ানটের সভাপতি সরওয়ার আলী অনুষ্ঠানে বক্তব্যে বলেন, ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে “ধর্মনিরপেক্ষ” রাষ্ট্রের বীজ রোপিত হয়েছিল, স্বাধীনতার সংগ্রাম ১৯৭১ সালের পথে সেই ধারাকে শক্তিশালী করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৫২ সালের শহীদদের ত্যাগের ঋণ এখনও বাঙালি জাতির বুকের মধ্যে অনস্বীকার্যভাবে রয়েছে, যার ফলে বাংলার মানুষ নিজেদের পরিচয় ও সংস্কৃতিকে গর্বের সাথে ধারণ করতে পেরেছে।

সরওয়ার আলী বলেন, ভাষা একটি জাতিকে সংজ্ঞায়িত করে, আর সংস্কৃতি তার জীবনধারার প্রকাশ। তিনি সতর্ক করে দেন, লিখিত আকারে সংরক্ষণ ছাড়া ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়া ভাষা জাতীয়তাকে ধর্মের ঊর্ধ্বে তুলে আনে এবং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি করে। তিনি ছায়ানটের ইতিহাসও স্মরণ করান, noting that ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অনেক অংশগ্রহণকারীই ১৯৬০-এর দশকে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, “যদি একুশে স্মরণ না করা হয়, ১৯৭১-এর ঘটনাও অন্ধকারে ঢেকে যাবে। আর যদি ১৯৭১ ভুলে যাওয়া হয়, বাঙালি জাতীয় পরিচয় টিকতে পারবে না। এজন্য ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জীবনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে।”

অনুষ্ঠানের প্রধান পরিবেশনা

প্রথম পরিবেশনা ছিল নাজিম মাহমুদের “আমাদের চেতনার সঈকোতে” একটি দলবদ্ধ কোরাস। এরপর একের পর এক শিল্পী ও কবির আবৃত্তি ও সঙ্গীত পরিবেশন।

শিল্পীরচনাধরন
সুষ্মিতা দেবনাথ শুচি“মোদের গর্ব মোদের আশা” – অতুলপ্রসাদ সেনগান
ইফাত বিনতে নাজির“নিশিদিন ভরসা রাখিস” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরগান
ধ্রুব সরকার“সালাম সালাম হাজার সালাম” – ফজল-ই-খুদাগান
প্রিয়ান্তু দেব“অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিলে” – আবু হেনা মোস্তফা কামালগান
ঐশ্বর্য সমাদ্দার“ও আমার এই বাংলা ভাষা” – আব্দুল লতিফগান
মোহিত খান“মাগো ধন্য হলো” – এসএম হেদায়েতগান
নুসরাত জাহান রুনা“আমায় গণেতে দাও না মাগো” – নজরুল ইসলাম বাবুগান
অর্ণব বড়ুয়া“মাগো অতি ফলগু্নের কথা” – আব্দুল লতিফগান
ফারজানা আফরিন এভা“আমার দেশের মতো এমন”গান
সুমন মজুমদার“ভাবো নাগো মা তোমার ছেলেরা” – মোস্তাফিজুর রহমানগান
দালিয়া আহমেদ ও দেওয়ান সাইদুল হাসান“মাতৃভূমির জন্য” – সৃষ্টি সেন; “একুশে ফেব্রুয়ারি” – আসিম সাহাআবৃত্তি

উপসংহার করা হয় আব্দুল গফফার চৌধুরীর “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” কোলকাতা দলবদ্ধ পরিবেশনার মাধ্যমে, এবং সমাপনী জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা” দিয়ে অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ করা হয়।

অনুষ্ঠানটি কেবল অতীত স্মরণ করাই নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে বাঙালি ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবোধের প্রতি উদ্দীপ্ত করার একটি প্রাণবন্ত প্রতীক হিসেবে দাঁড়ালো।

মোটপক্ষের অনুষ্ঠানটি প্রমাণ করল যে ভাষা ও সংস্কৃতি বাঙালি জাতিকে একত্রিত রাখার অন্যতম শক্তিশালী শক্তি।