নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক চাপে পড়েছে। দলটির ভেতরে নেতৃত্ব সংকট, আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় একের পর এক শীর্ষ নেতা দল ছাড়ছেন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের পরিচিত মুখগুলোর বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন বা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে দলটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পটভূমিতে নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেই দলটির জন্য এমন ভাঙন মারাত্মক সাংগঠনিক ধাক্কা। জামায়াতের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তকে এনসিপির একাংশ আদর্শবিরোধী ও রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত দলটির ঘোষিত নীতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত কয়েক সপ্তাহে। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও মুখপাত্র মুশফিক উস সালেহীন সব ধরনের পদ-পদবি থেকে পদত্যাগ করে জানান, এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে আপসে জড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ও পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ। এর আগে ডা. তাসনিম জারা ও আরও কয়েকজন শীর্ষ নারী নেতা দল ছাড়েন, যা এনসিপির নারী নেতৃত্বে বড় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল, এনসিপি একটি স্বতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে। কিন্তু ধারাবাহিক পদত্যাগ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সেই প্রত্যাশা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেক শহীদ পরিবারের সদস্য বলছেন, এনসিপির দুর্বলতা তাদের ন্যায়বিচার ও প্রতিশ্রুত সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, দলটির নেতৃত্ব যদি দ্রুত অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র জোরদার, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা আনা এবং আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট না করে, তবে এই ভাঙন আরও গভীর হবে। ইতোমধ্যে অন্তত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন এবং আরও অনেকে পদত্যাগের প্রস্তুতিতে রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এনসিপি থেকে পদত্যাগকারী কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার তালিকা
| ক্রম | নাম | দায়িত্ব |
|---|---|---|
| ১ | ডা. তাসনিম জারা | জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব |
| ২ | মুশফিক উস সালেহীন | মুখপাত্র ও মিডিয়া সেল প্রধান |
| ৩ | খালেদ সাইফুল্লাহ | যুগ্ম আহ্বায়ক |
| ৪ | খান মো. মুরসালীন | যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক |
| ৫ | তাজনূভা জাবীন | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ৬ | ফারহাদ আলম ভূঁইয়া | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ৭ | আরিফ সোহেল | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ৮ | আজাদ খান ভাসানী | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ৯ | আসিফ নেহাল | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১০ | মীর হাবিব আল মানজুর | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১১ | মারজুক আহমেদ | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১২ | মীর আরশাদুল হক | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১৩ | ওয়াহিদুজ্জামান | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১৪ | আল আমিন টুটুল | কেন্দ্রীয় নেতা |
সব মিলিয়ে, এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা। নতুন ধারার রাজনীতির যে স্বপ্ন দেখিয়ে দলটি যাত্রা শুরু করেছিল, তা বাস্তবে রূপ দিতে পারবে কি না—এই প্রশ্নই এখন রাজনীতির অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত।
