প্রায় দশ বছর ধরে দেশের রাজধানী ঢাকা শহর এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে অমীমাংসিত খুনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই হত্যার ঘটনাগুলোর মধ্যে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ও সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। বিশেষ করে আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার মিথুনের হত্যা মামলাটি সেই রহস্যময় ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি, যা আজও সমাধান হয়নি। প্রায় নয় বছর আগে রাজধানীর রামপুরার একটি আবাসিক এলাকায় নিজের বাসায় ফাহমিদা আক্তারকে হত্যার পর লাশ পড়েছিল হাত-পা বাঁধা অবস্থায়। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সময় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না, তাই খুনিদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
সাধারণ মানুষের চোখে খুনের রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছেন। রাজধানীতে ১১টির বেশি চাঞ্চল্যকর হত্যার তদন্তে এখনো কোনো কার্যকর ক্লু বের করা যায়নি। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে পাঁচটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে পৌঁছেছে। ২০১৩ সালের ৯ মার্চ খিলক্ষেত কুড়িল বিশ্বরোডের রেললাইনের পাশে সুরকার ও গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ছোট ভাই মিরাজ আহমেদকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয় ডিবি থেকে, পরে সিআইডির হাতে চলে যায়। ২০১৫ সালে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন, যেখানে বলা হয়, কোন ক্লু পাওয়া যায়নি।
২০১৫ সালের ১৩ মে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটে গৃহবধূ সুইটি আক্তার ও তাঁর মামা আমিনুল ইসলামকে হত্যা করা হয়। তিন বছর পর তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে। খুনিদের খুঁজে না পেয়ে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা অভিযোগ করেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে থানা-পুলিশ ও ডিবি যথাযথ আলামত সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় খুনিরা শনাক্ত হয়নি।
২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর মগবাজারের মধুবাগে ডলি রানী বণিক হত্যাকাণ্ড, ২০১২ সালের হাজারীবাগে ১২ বছরের তাসনিম রহমান করবীর হত্যাকাণ্ড, ২০১৪ সালের পূর্ব রাজাবাজারে মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীর হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের গোপীবাগে লুৎফর রহমান ফারুকসহ ছয়জনকে হত্যাকাণ্ড — এ সকল ঘটনার তদন্ত এখনও রহস্যের অন্তর্গত।
এছাড়াও ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী আবু বকরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যা রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদে লাশ পাওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তার তদন্তও এখনও সম্পন্ন হয়নি। সিআইডি এবং পিবিআই দুই সংস্থাই এই খুনের রহস্য উন্মোচনে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ না হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্লু নষ্ট হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যর্থতা সাধারণ মানুষকে হতাশ করেছে এবং আদালত ও তদন্ত সংস্থার প্রতি আস্থা কমিয়েছে।
এভাবে ১০ বছরের মধ্যে সারা দেশে ১ হাজার ৩০০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের রহস্য চূড়ান্তভাবে উদ্ঘাটন করতে না পারার ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে। পরিবারগুলো এখনও বিচারবঞ্চিত, এবং প্রত্যেক হত্যাকাণ্ডের পেছনের রহস্য উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত সমাজে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকবে।
