হরমুজ সংকটে জ্বালানি পরিবহন ব্যয় ও বীমা প্রিমিয়ামে উল্লম্ফন

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সামরিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ কম্পন সৃষ্টি করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ধমনী হিসেবে পরিচিত এই জলপথটি কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় সামুদ্রিক বাণিজ্যে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। তেলের ট্যাঙ্কারের ভাড়া বৃদ্ধি, যুদ্ধঝুঁকি বীমার (War-risk Insurance) আকাশচুম্বী প্রিমিয়াম এবং শত শত জাহাজের জট—সব মিলিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজার। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।

তেল পরিবহন ও ট্যাঙ্কার ভাড়ার লাগামহীন বৃদ্ধি

হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং বাজারে হাহাকার পড়ে গেছে। বিশেষ করে বিশাল আকৃতির ক্রুড অয়েল ট্যাঙ্কার বা ভিএলসিসি (VLCC) গুলোর চার্টার ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক ট্যাঙ্কার ভাড়ার সূচক ‘ওয়ার্ল্ডস্কেল’ (Worldscale)-এ দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয় অভিমুখী রুটগুলোতে ভাড়া এখন কয়েকশ পয়েন্টে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে কাতার, কুয়েত এবং ইরাক থেকে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর বিশাল আর্থিক বোঝা চেপে বসছে।


হরমুজ সংকটে সামুদ্রিক বাণিজ্যের বর্তমান চিত্র

সূচক/বিষয়সংকটের আগের অবস্থাবর্তমান অবস্থা (মার্চ ২০২৬)প্রভাব
বীমা প্রিমিয়ামজাহাজের মূল্যের ০.২৫%জাহাজের মূল্যের ০.৭৫% – ১.০%বীমা ব্যয় প্রায় ৫০-১০০% বৃদ্ধি।
জাহাজ জটস্বাভাবিক চলাচল১৫০+ ট্যাঙ্কার অপেক্ষায়লজিস্টিক চেইন ও সরবরাহে বিলম্ব।
ভিএলসিসি ভাড়াসাধারণ রেটকয়েকশ ওয়ার্ল্ডস্কেল পয়েন্টপরিবহন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি।
বিকল্প রুট ব্যবহারসীমিতহাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন (পূর্ণ ক্ষমতা)হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানির চেষ্টা।

বীমা বাজারে অস্থিরতা ও প্রিমিয়াম বৃদ্ধি

সামুদ্রিক বীমা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (Underwriters) বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমাকে ‘অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অনেক বীমা কোম্পানি ইতিমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য তাদের বিদ্যমান কভার বাতিলের নোটিশ জারি করেছে। বীমা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মার্শ’-এর দেওয়া তথ্যমতে, আগে যেখানে ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি জাহাজের জন্য প্রতি ভ্রমণে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার বীমা গুনতে হতো, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ৩ লাখ ৭৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রিমিয়াম ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা সরাসরি তেলের খুচরা বাজারে প্রভাব ফেলবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আঞ্চলিক লজিস্টিক ঝুঁকি

সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে এক ত্রিভুজ সংকটের মুখোমুখি। ওপেকের অন্যতম বড় উৎপাদক হিসেবে তাদের তেল রপ্তানি যেমন ঝুঁকির মুখে, তেমনি দুবাইয়ের জেবেল আলির মতো বিশাল ট্রানশিপমেন্ট হাবগুলো স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। যদিও আবুধাবি থেকে হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে রপ্তানি করা সম্ভব, কিন্তু কাতারের এলএনজি এবং কুয়েতের তেলের জন্য এই বিকল্প পথ যথেষ্ট নয়। ফলে পুরো অঞ্চলের বাণিজ্যিক নির্ভরযোগ্যতা এখন প্রশ্নের মুখে।

বৈশ্বিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতির পদধ্বনি

বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির বড় একটি অংশ এই ২০ মাইল প্রশস্ত প্রণালী দিয়ে যায়। বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কেবল ১০০ ডলার নয়, বরং রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এর ফলে সারাবিশ্বে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হবে। কেবল জ্বালানি নয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি হওয়া অ্যালুমিনিয়াম এবং সারের বৈশ্বিক সরবরাহও এই সংকটের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে।

পরিশেষে, হরমুজ প্রণালীর এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিকল্প নৌ-পথের সন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং বীমা প্রিমিয়ামের এই বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের কাঁধেই এসে পড়বে।