হরমুজ উত্তেজনায় তেলের দাম বৃদ্ধি

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবার বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম প্রায় চার শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় দৈনিক উত্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়ায় বাজারে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।

বাজার তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ধরণের অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে চার দশমিক এক এক শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি একশ পাঁচ দশমিক পঁয়তাল্লিশ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ধরণের তেলের দাম চার দশমিক ঊনপঞ্চাশ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি নিরানব্বই দশমিক আশি ডলারে উঠে গেছে।

তেলের দামের পরিবর্তন

তেলের ধরনদাম (ব্যারেলপ্রতি ডলার)পরিবর্তন
ব্রেন্ট১০৫ দশমিক ৪৫+৪ দশমিক ১১ শতাংশ
ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট৯৯ দশমিক ৮০+৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ

বিশ্ব অর্থনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়াকে মার্কিন প্রশাসন অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করার পর বাজারে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়, ফলে যেকোনো বিঘ্ন বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমানে তেলের বাজার পুরোপুরি ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক বক্তব্য, সামরিক অবস্থান এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ বাজারের দামে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে।

এদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দুই মাসে বিশ্বব্যাপী প্রায় এক বিলিয়ন ব্যারেল তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সময় লাগবে, এমনকি সরবরাহ পুনরুদ্ধার শুরু হলেও বাজার স্থিতিশীল হতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে কিছু তেলবাহী ট্যাঙ্কারের বিশেষ কৌশল। নিরাপত্তার কারণে অনেক জাহাজ তাদের অবস্থান সংকেত বন্ধ রেখে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে, যাতে সম্ভাব্য হামলা বা নজরদারি এড়ানো যায়। এতে বাজারে স্বচ্ছতা কমে গিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে আসন্ন কূটনৈতিক বৈঠক নিয়েও বাজারে নজর রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায় হরমুজ সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বৃহৎ শক্তিগুলোর কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত তেলের দামে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।