হবিগঞ্জে নারীর অর্থনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি

হবিগঞ্জের প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকায় নারীরা সংসার ও পরিবারের দায়িত্বের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনলাইন উদ্যোগ, কৃষি ও গুচ্ছ উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ শুধুমাত্র নিজস্ব জীবিকা বৃদ্ধিই নয়, বরং জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। নারীরা ব্যবসা, চাকরি, প্রবাসী আয়, এসএমই উদ্যোগ, কৃষি ও সেবা খাতে সমানভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছেন।

২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, হবিগঞ্জের মোট জনসংখ্যা ২৩,৫৮,৮৮৬। এর মধ্যে নারী সংখ্যা ১২,১৪,৪২৯, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫২ শতাংশ। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা প্রায় ৪২ শতাংশ।

চা-বাগানে নারীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান

হবিগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদন অঞ্চল। জেলার ২৩টি চা-বাগান থেকে দেশের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ আসে। চা উৎপাদনে শ্রমিকদের ৬০–৭০ শতাংশই নারী।

নালুয়া চা-বাগানের মিতা রানী ত্রিপুরা (৪৫) গত এক দশকে নিজেকে এবং সহকর্মীদের মধ্যে অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এক সময় তার দৈনিক চা-পাতার উৎপাদন ছিল ২০–২২ কেজি, যা বর্তমানে ৪০–৪৫ কেজি। মিতা তার আয়ের মাধ্যমে দুই সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন এবং স্বামীকে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে সহায়তা করেছেন।

কৃষিতে নারীর অবদান

হবিগঞ্জে নারীদের প্রায় ২৬ শতাংশ কৃষিকাজে যুক্ত। ধান, সবজি, ফুল ও হর্টিকালচারাল ফসল চাষ, বীজতলা তৈরি, ধান মাড়াই—নারীরা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

উদাহরণস্বরূপ, সদর উপজেলার রিচি গ্রামের মিন্নি আক্তার হোমস্টেড পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগি, মাছ ও সবজি চাষ মিলিয়ে পরিবারের আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় মহিলাদের প্রশিক্ষণও দিচ্ছেন।

শিল্প খাতে নারীর জয়গান

শায়েস্তাগঞ্জের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রায় ১২,০০০ নারী কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে অনেকে বিধবা, বিচ্ছিন্ন বা পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম। অনেকে অপারেটর, লাইন ইনচার্জ বা সুপারভাইজার পদেও উন্নীত হয়েছেন।

চুনারুঘাটের মণি মুন্ডা (২৮) পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। অসুস্থ বাবার দেখাশোনা করছেন এবং দুই বোনের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার খরচ চালাচ্ছেন। তিনি স্থানীয় নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।

প্রবাসী নারীর অর্থনৈতিক অবদান

দুধপাতিল গ্রামে প্রায় ৩০০ নারী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত এবং নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এটি গ্রামের ঘরবাড়ি, জমি ও শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। রুনা খাতুন প্রবাসে কাজ করে ১২ লাখ টাকায় জমি ক্রয় করেছেন, বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং স্বামীকে সহযোগিতা করেছেন।

নারী উদ্যোক্তা

নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প ও এনজিও সহায়তা এবং এসএমই ঋণের মাধ্যমে পারভীন আক্তার প্রাথমিকভাবে সেলাই মেশিন দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তার ব্যবসার পুঁজি ২০ লাখ টাকা এবং তিনি ১৫–২০ নারী কর্মীকে কর্মসংস্থান দিয়েছেন।

হবিগঞ্জে নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড

খাতনারীর সংখ্যা / অংশগ্রহণউল্লেখযোগ্য উদাহরণ
চা-বাগান শ্রমিক৬০–৭০%মিতা রানী ত্রিপুরা
কৃষি২৬%মিন্নি আক্তার
শিল্প-কারখানা১২,০০০ নারীমণি মুন্ডা
প্রবাসী কর্মী~৩০০ নারীরুনা খাতুন
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা১৫–২০ কর্মীপারভীন আক্তার

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব। হবিগঞ্জের নারীরা বিভিন্ন খাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের জীবন, পরিবারের অর্থনীতি এবং জেলার অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছেন।