বাংলা কথাসাহিত্যের আকাশে যে ক’জন লেখক দীপ্ত নক্ষত্র হয়ে জ্বলে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম সমরেশ মজুমদার। এপার-ওপার দুই বাংলার পাঠকমনে সমানভাবে প্রিয় এই ঔপন্যাসিক তাঁর লেখনীতে তুলে এনেছেন সময়, সমাজ, প্রেম, রাজনীতি এবং মানুষের অন্তর্জগতের গভীর টানাপোড়েন।
জন্ম: ১০ মার্চ ১৯৪২, জলপাইগুড়ি
মৃত্যু: ৮ মে ২০২৩
শৈশব কেটেছে ডুয়ার্সের সবুজ চা-বাগানের নিসর্গে—প্রকৃতির সেই মায়াবী স্পর্শ তাঁর সাহিত্যজীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। প্রাথমিক শিক্ষা জলপাইগুড়ি জিলা স্কুল-এ, এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি যুক্ত ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকা-র সঙ্গে। পাশাপাশি গ্রুপ থিয়েটারের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ, যা তাঁর সাহিত্যকর্মে নাটকীয়তা ও জীবন্ত সংলাপের শক্তি এনে দেয়।
তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা হয় ‘অন্যমাত্রা’ গল্প দিয়ে, যা প্রথমে মঞ্চনাটক হিসেবে রচিত হয়েছিল এবং পরে ১৯৬৭ সালে দেশ পত্রিকা-তে প্রকাশিত হয়। প্রথম উপন্যাস দৌড় প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে, যা তাঁকে সাহিত্যাঙ্গনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সমরেশ মজুমদারের লেখার পরিধি ছিল বিস্তৃত—উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর সাহিত্য—সবখানেই তিনি ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো যেন জীবন্ত, সময়ের সঙ্গে হেঁটে চলা মানুষ।
উল্লেখযোগ্য রচনা:
সাতকাহন
তেরো পার্বণ
স্বপ্নের বাজার
উজান গঙ্গা
আট কুঠুরি নয় দরজা
অনুরাগ
তাঁর সৃষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং কালজয়ী ট্রিলজি—
উত্তরাধিকার
কালবেলা
কালপুরুষ
এই তিনটি উপন্যাস শুধু সাহিত্য নয়, এক সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। বিশেষ করে ‘কালবেলা’ এক প্রজন্মের চেতনা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
আনন্দ পুরস্কার (১৯৮২)
সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪)
সমরেশ মজুমদার কেবল একজন লেখক নন; তিনি ছিলেন সময়ের কথক, মানুষের অন্তর্লোকের সূক্ষ্ম বিশ্লেষক। তাঁর লেখায় প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে সংগ্রাম, সমাজের দ্বন্দ্ব, আর মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার গল্প।
২০২৩ সালের ৮ মে তাঁর প্রস্থান বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। তবুও তাঁর সৃষ্টি, তাঁর চরিত্র, তাঁর ভাষা—সবকিছুই তাকে অমর করে রেখেছে পাঠকের হৃদয়ে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি সেই কালপুরুষকে—যিনি শব্দ দিয়ে সময়কে বেঁধে রেখেছিলেন চিরকালের জন্য।
