লোকসঙ্গীতের চিরন্তন কণ্ঠ আবদুর রহমান বয়াতি

বাংলার মাটি, মানুষের প্রাণ আর খাঁটি অনুভূতির সুরবাহক ছিলেন আবদুর রহমান বয়াতি। তিনি লোকসঙ্গীতের অমলিন ঐতিহ্যকে নিজের জীবনের দর্শন হিসেবে ধারণ করেছিলেন এবং কণ্ঠ ও সুরের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তার গান ছিল মানুষের জীবনবোধ, আত্মিক অনুসন্ধান ও সামাজিক বাস্তবতার দর্পণ।

১৯৩৬ সালের ২১ নভেম্বর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের দয়াগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। ছোটবেলা থেকেই লোকগান ও বাউল সঙ্গীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং দোতারার অতুলনীয় শিল্পী হিসেবে। দোতারা ছিল তার আত্মার ভাষা, যার মাধ্যমে তিনি মানুষের অন্তর্গত অনুভূতিকে প্রকাশ করতেন।

লোকসঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালে তাকে প্রদান করা হয় একুশে পদক। এই রাষ্ট্রীয় সম্মান তার দীর্ঘ শিল্পযাত্রার গুরুত্বকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৮২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব বাউল দল ‘আবদুর রহমান বয়াতি’, যা দেশের লোকসঙ্গীত আন্দোলনে একটি শক্তিশালী ভূমিকা রাখে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাউল সঙ্গীতের পরিচিতি বাড়ায়।

দোতারা ছাড়াও হারমোনিয়াম, খঞ্জনি ও ভায়োলিনসহ নানা বাদ্যযন্ত্রে তার দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের বিশেষ গ্রেডের এই শিল্পীর পাঁচশোরও বেশি একক অ্যালবাম রয়েছে, যা তাকে লোকসঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ৪২টি দেশে তিনি লোকসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে তার গান পরিবেশন ছিল বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

‘মন আমার দেহঘড়ি’, ‘মা আমেনার কোলে ফুটল ফুল’, ‘ছেড়ে দে নৌকা মাঝি যাবো মদিনা’সহ অসংখ্য গান তাকে অমর করে রেখেছে। ১৯৮৯ সালে ‘অসতী’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও তিনি দর্শকের মন জয় করেন। ২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেও তার সুর ও দর্শন আজও বাংলার হৃদয়ে জীবন্ত।

জিলাইভ/টিএসএন