মানবসভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে থেকেই সোনা মানুষের কাছে কেবল একটি উজ্জ্বল হলুদ ধাতু ছিল না; এটি ছিল ক্ষমতা, আভিজাত্য এবং ঐশ্বর্যের চূড়ান্ত প্রতীক। ফারাওদের মিশর থেকে শুরু করে আধুনিক ওয়াল স্ট্রিট—সোনার কদর কোথাও কমেনি। অর্থনীতির ভাষায় সোনাকে বলা হয় ‘স্টোর অফ ভ্যালু’ বা মূল্য সঞ্চয়ের আধার। পৃথিবীর যেকোনো মুদ্রা, তা মার্কিন ডলার হোক বা ইউরো, সময়ের সাথে সাথে তার ক্রয়ক্ষমতা হারাতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি বা সরকারের ভুল নীতির কারণে কাগজের টাকার মান শূন্যে নেমে আসার ভুরি ভুরি নজির ইতিহাসে রয়েছে। কিন্তু সোনার ক্ষেত্রে এমনটি কখনো ঘটেনি। এক আউন্স সোনা দিয়ে রোমান যুগে যে পরিমাণ পণ্য কেনা যেত, আজও প্রায় সেই একই পরিমাণ পণ্য কেনা যায়। এই বিশ্বাস এবং ঐতিহাসিক স্থায়িত্বই সোনার দামের মূল ভিত্তি। যখনই মানুষ কাগজের মুদ্রা বা শেয়ার বাজারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখনই তারা সোনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই মনস্তাত্ত্বিক আস্থাই সোনার দামকে অন্যান্য যেকোনো পণ্য বা কমোডিটি থেকে আলাদা করে রেখেছে। সোনা কোনো সরকার ছাপায় না, এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যায় না এবং এটি ধ্বংস করাও প্রায় অসম্ভব—এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই একে হাজার বছর ধরে অর্থনীতির কেন্দ্রে টিকিয়ে রেখেছে।
Table of Contents
বিশ্ববাজারে সোনার দাম ওঠানামার নেপথ্য কারণ ও বিশ্লেষণ

গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড থেকে বর্তমান যুগ: মূল্যের বিবর্তন:
সোনার দামের গতিপ্রকৃতি বুঝতে হলে আমাদের পেছনের ইতিহাসে তাকাতে হবে, বিশেষ করে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ ব্যবস্থার দিকে। একটা সময় ছিল যখন প্রতিটি দেশের কাগজের মুদ্রা সেই দেশের সরকারের কাছে গচ্ছিত সোনার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ছাপানো হতো। অর্থাৎ, আপনি চাইলে ব্যাংকে গিয়ে আপনার কাগজের নোট জমা দিয়ে সমপরিমাণ সোনা দাবি করতে পারতেন। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন ডলারকে বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা করা হয় এবং ডলারকে সোনার সাথে পেগ বা যুক্ত করা হয়। তখন ৩৫ ডলারে এক আউন্স সোনা পাওয়া যেত। কিন্তু ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন যখন ডলারকে সোনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন (যাকে ‘নিক্সন শক’ বলা হয়), তখন থেকেই সোনার দাম মুক্তবাজারে ওঠানামা করতে শুরু করে। এরপর থেকেই সোনা একটি সাধারণ পণ্যের মতো চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে কেনাবেচা হতে থাকে। তবে সাধারণ পণ্যের সাথে এর বড় পার্থক্য হলো, সোনা একই সাথে একটি পণ্য (গয়না বা শিল্পের কাঁচামাল) এবং একটি বিনিয়োগ সম্পদ (মুদ্রার বিকল্প)। এই দ্বৈত সত্তার কারণেই সোনার দামের ভবিষ্যদ্বাণী করা শেয়ার বাজারের চেয়েও কঠিন। কখনো এটি শেয়ার বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ে, আবার কখনো শেয়ার বাজার ধসে পড়লে সোনার দাম রকেটের গতিতে বাড়তে থাকে।
চাহিদার ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সমীকরণ: পূর্ব বনাম পশ্চিম:
বিশ্ববাজারে সোনার দাম নির্ধারণে কেবল পশ্চিমা বিশ্বের শেয়ার বাজার বা ব্যাংকগুলোই ভূমিকা রাখে না; বরং এশিয়ার সাংস্কৃতিক আবেগ এখানে একটি বিশাল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত সোনার অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহৃত হয় গয়না তৈরিতে, আর এই গয়নার চাহিদার সিংহভাগ আসে ভারত ও চীন থেকে। এই দুই দেশে সোনা কেনা কেবল বিলাসিতা নয়, এটি তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতে বিয়ে বা উৎসবে কনের গায়ে সোনা পরানোকে একটি সামাজিক মর্যাদা এবং মেয়েদের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। একইভাবে, চীনে নববর্ষ বা লুনার নিউ ইয়ারের সময় উপহার হিসেবে সোনা দেওয়া একটি দীর্ঘদিনের প্রথা। যখন এই দুই দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভালো থাকে এবং মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত টাকা আসে, তখন বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা বেড়ে যায় এবং দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে (যেমন আমেরিকা বা ইউরোপে) সোনাকে দেখা হয় মূলত বিনিয়োগ হিসেবে। সেখানে মানুষ গয়না কেনার চেয়ে বারের আকারে বা গোল্ড ইটিএফ (Exchange Traded Fund)-এর মাধ্যমে সোনা কিনে রাখে। অর্থাৎ, যখন পূর্বে উৎসব চলে তখন চাহিদা বাড়ে, আবার যখন পশ্চিমে অর্থনৈতিক মন্দার ভয় দেখা দেয় তখনো চাহিদা বাড়ে। এই দুই মেরুর চাহিদার ভারসাম্যই সোনার আন্তর্জাতিক দাম নির্ধারণ করে।
খনি থেকে ভল্ট: যোগানের সীমাবদ্ধতা ও ‘পিক গোল্ড’ তত্ত্ব:
সোনার দাম বাড়ার পেছনে একটি বড় কারণ হলো এর সীমিত যোগান। পৃথিবীজুড়ে মাটির নিচে বা পাহাড়ের গুহায় যত সোনা ছিল, তার একটি বিশাল অংশ ইতিমধ্যেই উত্তোলন করা হয়ে গেছে। খনি বিশেষজ্ঞরা অনেকেই ‘পিক গোল্ড’ (Peak Gold) তত্ত্বের কথা বলেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আমরা হয়তো এমন এক সময়ে পৌঁছে গেছি বা খুব শীঘ্রই পৌঁছাব, যেখান থেকে সোনার উৎপাদন আর বাড়বে না, বরং ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। নতুন কোনো বিশাল সোনার খনি গত এক দশকে আবিষ্কৃত হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা, যা একসময় বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ ছিল, সেখানে এখন উৎপাদন অনেক কমে গেছে কারণ খনিগুলো এত গভীর হয়ে গেছে যে সেখান থেকে সোনা তোলা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে এক আউন্স সোনা মাটির নিচ থেকে তুলতে যে পরিমাণ জ্বালানি, যন্ত্রপাতি এবং শ্রমিকের খরচ হয়, তা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই উৎপাদন খরচ বা ‘অল-ইন সাসটেইনিং কস্ট’ (AISC) বাড়ার কারণে খনি কোম্পানিগুলো কম দামে সোনা বিক্রি করতে পারে না। ফলে বিশ্ববাজারে এর একটি ন্যূনতম ফ্লোর প্রাইস বা ভিত্তি মূল্য তৈরি হয়। এছাড়া পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে নতুন খনি খনন করা এখন অনেক কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতা (নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে)
‘সেফ হ্যাভেন’ তত্ত্ব ও ভয়ের বাণিজ্য (Fear Trade):
অর্থনীতিবিদরা সোনাকে প্রায়শই ‘ক্রাইসিস কমোডিটি’ বা সংকটের পণ্য হিসেবে অভিহিত করেন। যখনই বিশ্বজুড়ে কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ বা কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়, তখনই শেয়ার বাজার বা বন্ড মার্কেটে ধস নামে। বিনিয়োগকারীরা তখন তাদের সম্পদ হারানোর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ে তারা এমন এক সম্পদের খোঁজ করেন যা কোনো নির্দিষ্ট দেশের সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং যার মান শূন্যে নামার সম্ভাবনা নেই। ঐতিহাসিকভাবে সোনাই হলো সেই ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল। একে বলা হয় ‘ফিয়ার ট্রেড’ বা ভয়ের বাণিজ্য। যখন মানুষের মনে ভবিষৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করে, তখন তারা ঝুঁকি এড়াতে সোনা কেনা শুরু করেন। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বা কোনো দেশের সরকার পতন হলে তেলের দামের পাশাপাশি সোনার দামও হু হু করে বাড়তে থাকে। কারণ, সোনা কোনো ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি ফিজিক্যাল বা দৃশ্যমান সম্পদ যা পকেটে নিয়ে পালানো যায় বা ভল্টে লুকিয়ে রাখা যায়। এই মনস্তাত্ত্বিক আস্থাই সংকটের সময় সোনার চাহিদাকে আকাশচুম্বী করে তোলে।
যুদ্ধের দামামা: রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও আধুনিক স্বর্ণবাজার:
আধুনিক সময়ে ভূ-রাজনীতির প্রভাবে সোনার দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর পরপরই বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বিশাল অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটকে দেয়। এই ঘটনাটি সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের এবং অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে একটি বড় বার্তা দেয়—‘ডলার বা ইউরোতে রাখা সম্পদ নিরাপদ নাও হতে পারে’। এর ফলে সোনার দাম দ্রুত বেড়ে আউন্স প্রতি ২০০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। আর আমরা জানি, মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে টাকার মান কমে এবং মানুষ টাকা বা ডলারের বদলে সোনা হাতে রাখতে পছন্দ করে। এছাড়া, ইউক্রেন যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে যখন সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন শেয়ার বাজার অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এই অস্থিরতা থেকে বাঁচতে বড় বড় হেজ ফান্ডগুলো তাদের পোর্টফোলিওতে সোনার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা কৃত্রিমভাবে সোনার দামকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়।
মহামারী ও ব্ল্যাক সোয়ান ইভেন্ট: কোভিড-১৯ এর শিক্ষা:
অর্থনীতিতে ‘ব্ল্যাক সোয়ান ইভেন্ট’ বলতে এমন ঘটনাকে বোঝায় যা কেউ আগে থেকে ধারণা করতে পারে না, কিন্তু যার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারী ছিল এমনই এক ঘটনা। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে বিশ্বজুড়ে লকডাউন শুরু হলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। শুরুতে সোনার দাম কিছুটা কমলেও, খুব দ্রুত তা ঘুরে দাঁড়ায় এবং সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ডে পৌঁছে যায় (আগস্ট ২০২০-এ প্রতি আউন্স ২০৭৫ ডলার)। এর কারণ ছিল অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। মানুষ জানত না এই মহামারী কতদিন চলবে বা তারা আদৌ চাকরি ফিরে পাবে কি না। এই ভীতি থেকে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বিনিয়োগকারীরা নগদ টাকা দিয়ে সোনা কিনে রাখতে শুরু করেন। পাশাপাশি, মহামারী মোকাবিলায় সরকারগুলো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। বাজারে এই বিপুল পরিমাণ কাগুজে মুদ্রা আসার ফলে ডলারের মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই আশঙ্কাই বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণমুখী করে তোলে। অর্থাৎ, মহামারী কেবল স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং অর্থনৈতিক আস্থার সংকট তৈরি করে, যার সরাসরি সুবিধা পায় স্বর্ণবাজার।
অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব:
কেবল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নয়, অর্থনৈতিক যুদ্ধ বা ‘ট্রেড ওয়ার’ (Trade War) ও সোনার দামকে প্রভাবিত করে। বিগত কয়েক বছর ধরে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে যে শুল্ক যুদ্ধ চলছে, তা বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। যখন বিশ্বের দুই পরাশক্তি একে অপরের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চাকা শ্লথ হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা তখন মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে যাচ্ছে। মন্দার সময় কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যায়, তাই শেয়ার বাজারের আকর্ষণ কমে। তখন বিকল্প হিসেবে সোনার বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এছাড়া, আমেরিকা যখন ইরান বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন সেই দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ডলার ব্যবহার করতে পারে না। তখন তারা সোনা দিয়ে তেল বা পণ্য কেনাবেচা করার চেষ্টা করে। এই ধরনের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড গোল্ড ট্রেড’ বা গোপন স্বর্ণ বাণিজ্য বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা ধরে রাখে। সম্প্রতি ব্রিকস (BRICS) জোটের দেশগুলো (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) ডলারের বিকল্প হিসেবে একটি নতুন মুদ্রা চালুর চিন্তা করছে, যার ভিত্তি হতে পারে সোনা। এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক আলোচনাও সোনার দীর্ঘমেয়াদী চাহিদাকে উসকে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সরকার পতন:
উন্নত দেশগুলোতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও, উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোতে প্রায়ই সরকার বিরোধী আন্দোলন, ক্যু বা গৃহযুদ্ধ দেখা যায়। ভেনেজুয়েলা, তুরস্ক বা জিম্বাবুয়ের মতো দেশগুলোতে যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছিল, তখন তাদের স্থানীয় মুদ্রার মান প্রায় শূন্য হয়ে গিয়েছিল। এসব দেশের মানুষ তখন বাঁচার তাগিদে তাদের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে সোনা কিনে রাখার চেষ্টা করেছে। কারণ, সরকার বদলালে নোট অচল হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সোনা সব সরকারের আমলেই সমান মূল্যবান। স্থানীয় পর্যায়ে এই চাহিদা হয়তো বিশ্ববাজারের তুলনায় ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু সমষ্টিগতভাবে এটি সোনার দামের ওপর একটি বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যখন কোনো বড় অর্থনীতির দেশে (যেমন ব্রেক্সিট বা আমেরিকার নির্বাচন) রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন বিশ্ববাজারের বড় বড় ফাটকাবাজরা (Speculators) সোনার বাজারে বড় অঙ্কের বাজি ধরেন, যা দামকে মুহূর্তের মধ্যে বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিতে পারে।
মার্কিন ডলার ও মুদ্রাবাজারের প্রভাব (আধিপত্যের লড়াই)
ডলার বনাম সোনা: ঐতিহাসিক বিপরীতমুখী সম্পর্ক (Inverse Relationship):
বিশ্ববাজারে সোনার দাম নির্ধারণের অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ফ্যাক্টর হলো মার্কিন ডলারের মান। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা বা ‘স্পট গোল্ড’ (Spot Gold) সর্বদা মার্কিন ডলারে কেনাবেচা হয় (XAU/USD)। ফলে, ডলার এবং সোনার মধ্যে একটি পরিষ্কার বিপরীতমুখী বা ‘ইনভার্স’ সম্পর্ক বিদ্যমান। বিষয়টি একটি দাঁড়িপাল্লার মতো—যখন একপাশ ভারী হয়, অন্যপাশ হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়, তখন সোনার দাম সাধারণত কমে যায়। এর পেছনের গাণিতিক যুক্তিটি খুবই সরল: যেহেতু সোনার দাম ডলারে নির্ধারিত, তাই ডলারের মান বাড়লে বিদেশিদের (যাদের হাতে ডলার নেই) জন্য সোনা কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ধরুন, আপনি ইউরো বা ভারতীয় রুপিতে ব্যবসা করেন। ডলার শক্তিশালী হওয়া মানে আপনার স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া। তখন এক আউন্স সোনা কিনতে আপনাকে আগের চেয়ে বেশি স্থানীয় মুদ্রা খরচ করতে হবে। এতে চাহিদাও কমে যায় এবং বিশ্ববাজারে সোনার দাম নিম্নমুখী হয়। পক্ষান্তরে, যখন ডলার দুর্বল হয়, তখন সোনা সস্তা হয়ে যায় এবং দাম বাড়তে থাকে। এই ‘সিস’ (Seesaw) বা ওঠানামার খেলাটি স্বর্ণবাজারের প্রতিদিনের চিত্র।
ডলার ইনডেক্স (DXY) এবং বিনিয়োগকারীদের নজর:
পেশাদার স্বর্ণ ব্যবসায়ী বা হেজ ফান্ড ম্যানেজাররা সোনার চার্টের দিকে তাকানোর আগে সর্বদা ‘ইউএস ডলার ইনডেক্স’ বা ডিএক্সওয়াই (DXY)-এর দিকে তাকান। ডিএক্সওয়াই হলো এমন একটি সূচক যা বিশ্বের অন্য ছয়টি প্রধান মুদ্রার (ইউরো, জাপানি ইয়েন, ব্রিটিশ পাউন্ড, কানাডিয়ান ডলার, সুইডিশ ক্রোনা এবং সুইস ফ্রাঁ) বিপরীতে ডলারের শক্তি পরিমাপ করে। যখন ডিএক্সওয়াই ১০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে যায়, তখন বোঝা যায় ডলার এখন ‘কিং’ বা রাজার আসনে আছে। এই সময় বিনিয়োগকারীরা সোনা বিক্রি করে ডলার বা ইউএস ট্রেজারি বন্ড কিনতে শুরু করেন, কারণ ডলার হাতে রাখলে সুদ পাওয়া যায়, কিন্তু সোনা হাতে রাখলে কোনো বাড়তি আয় বা ‘ইল্ড’ (Yield) নেই। এটি সোনার জন্য নেতিবাচক। আবার যখন ডিএক্সওয়াই নিচে নামতে থাকে, তখন বোঝা যায় বিনিয়োগকারীরা ডলারের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। তখন তারা তাদের অর্থের সুরক্ষার জন্য আবার সোনার দিকে ফিরে আসেন। গত কয়েক দশকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বড় ধরনের কোনো স্বর্ণের র্যালি বা মূল্যবৃদ্ধি তখনই হয়েছে যখন ডলার ইনডেক্স দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল ছিল।
কারেন্সি ডিভ্যালুয়েশন বা মুদ্রার অবমূল্যায়ন:
ডলার ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুদ্রার মানও স্থানীয় বাজারে সোনার দামকে প্রভাবিত করে। যখন কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের মুদ্রার মান কমিয়ে দেয় (যাকে বলে ডিভ্যালুয়েশন) অথবা মুদ্রাস্ফীতির কারণে মুদ্রার মান প্রাকৃতিকভাবে কমে যায়, তখন স্থানীয় বাজারে সোনার দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্ক বা আর্জেন্টিনার কথা ধরা যাক। এই দেশগুলোর মুদ্রার মান যখন ডলারের বিপরীতে ধসে পড়েছিল, তখন সেখানে সোনার দাম ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কারণ, মানুষ তখন তাদের জমানো টাকা বাঁচাতে পাগলের মতো সোনা কিনতে শুরু করে। সোনা হলো একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা যা কোনো সরকার ছাপাতে পারে না বা যার মান কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখের কথায় কমে যায় না। একে বলা হয় ‘আল্টিমেট কারেন্সি’ বা চূড়ান্ত মুদ্রা। তাই যখনই ‘ফিয়াট মানি’ বা কাগজের টাকার প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়, তখনই সোনার জয়জয়কার শুরু হয়। এটি কেবল উন্নয়নশীল দেশেই নয়, বরং জাপান বা ইউরোপের মতো উন্নত অর্থনীতিতেও সত্য—যখন তাদের কারেন্সি দুর্বল হয়, তখন ইউরো বা ইয়েনে সোনার দাম বেড়ে যায়।
‘কিং ডলার’ বনাম বিশ্ববাণিজ্য যুদ্ধ:
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাণিজ্যে একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘ডি-ডলারাইজেশন’ (De-dollarization) বা ডলার-নির্ভরতা কমানো। রাশিয়া, চীন এবং ব্রিকস জোটের দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার কমিয়ে আনতে চাইছে। তারা নিজেদের রিজার্ভে ডলারের বদলে সোনা জমা করছে। এর একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সোনার বাজারে পড়ছে। যদিও স্বল্পমেয়াদে ডলার শক্তিশালী হলে সোনার দাম কমে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারের বিকল্প হিসেবে সোনাকে বেছে নেয়, তবে ডলার শক্তিশালী থাকলেও সোনার দাম কমবে না। আমরা বর্তমানে এমন একটি অদ্ভুত সময়ে আছি যেখানে ডলার এবং সোনা—উভয়ই শক্তিশালী হতে দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হলো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের ভয় থাকে, তখন মানুষ ইউরো বা পাউন্ডের চেয়ে ডলারকে বেশি নিরাপদ মনে করে, আবার একই সাথে তারা সোনাও কিনে রাখে। তবে সাধারণ নিয়মে, একটি শক্তিশালী ডলার সর্বদা সোনার জন্য একটি বড় বাধা বা ‘হেডউইন্ড’ (Headwind) হিসেবে কাজ করে।
সুদের হার এবং ডলারের মিথস্ক্রিয়া:
ডলারের শক্তি মূলত নির্ভর করে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারের ওপর। যখন আমেরিকায় সুদের হার বাড়ানো হয়, তখন সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা তাদের টাকা আমেরিকা বা মার্কিন বন্ডে নিয়ে যান। এতে ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং ডলার শক্তিশালী হয়। আর ডলার শক্তিশালী হওয়া মানেই সোনার ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া। কিন্তু যখন ফেড সুদের হার কমায় বা ডলার ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ে (Quantitative Easing), তখন ডলারের যোগান বেড়ে যায় এবং এর মান কমে। এই সস্তা ডলার তখন সোনার দামকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ, আপনি যদি সোনার দামের ভবিষ্যৎ বুঝতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই ফেডারেল রিজার্ভের মিটিং এবং তাদের সুদের হারের সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখতে হবে। সোনা এবং ডলারের এই দ্বৈরথ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রাচীন এবং রোমাঞ্চকর এক যুদ্ধ, যেখানে বিজয়ীর মুকুট প্রতিনিয়ত হাতবদল হতে থাকে।
সুদের হার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি (ফেড এবং অপ অপরচুনিটি কস্ট)
ফেডারেল রিজার্ভের জাদুদণ্ড: বাজারের আসল চালক:
বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি প্রবাদ আছে, “ফেডারেল রিজার্ভ যখন হাঁচি দেয়, তখন পুরো পৃথিবী সর্দিতে ভোগে।” আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ফেডারেল রিজার্ভ (Fed) হলো স্বর্ণবাজারের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। ফেডের মনেটারি পলিসি কমিটি (FOMC) বছরে আটবার বৈঠকে বসে সুদের হার নির্ধারণের জন্য। এই বৈঠকগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে সারা বিশ্বের সোনা ব্যবসায়ীরা। যখন ফেড সুদের হার বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, তখন তাকে বলা হয় ‘হকিশ’ (Hawkish) নীতি। সুদের হার বাড়লে ব্যাংকে টাকা রাখা বা মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কেনা অনেক লাভজনক হয়ে ওঠে। তখন বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ ও নিশ্চিত আয়ের আশায় সোনা বিক্রি করে বন্ড মার্কেটে টাকা সরিয়ে নেন। কারণ, বন্ড থেকে সুদ বা ‘ইল্ড’ পাওয়া যায়, কিন্তু সোনা কোনো সুদ দেয় না। ফলে সুদের হার বাড়লে সোনার দাম সাধারণত কমে যায়। বিপরীতভাবে, যখন ফেড সুদের হার কমানোর ঘোষণা দেয় (যাকে বলা হয় ‘ডোভিশ’ নীতি), তখন ব্যাংকে টাকা রেখে লাভ কমে যায়। তখন মানুষ আবার সোনার দিকে ঝুঁকে পড়ে, কারণ কম সুদের হারে টাকার মান কমে যাওয়ার ভয় থাকে।
সুযোগ ব্যয়ের তত্ত্ব (Theory of Opportunity Cost):
সোনার দামের সাথে সুদের হারের সম্পর্ক বোঝার জন্য অর্থনীতির ‘সুযোগ ব্যয়’ বা ‘অপ অপরচুনিটি কস্ট’ ধারণাটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সোনা হলো একটি ‘নন-ইলিডিং অ্যাসেট’ (Non-yielding Asset)। অর্থাৎ, আপনি যদি এক কেজি সোনা কিনে ভল্টে রেখে দেন, দশ বছর পর সেটি এক কেজিই থাকবে; এটি কোনো বাচ্চা দেবে না বা কোনো ডিভিডেন্ড বা সুদ প্রদান করবে না। এর লাভ কেবল তখনই হবে যদি এর দাম বাড়ে। অন্যদিকে, আপনি যদি সেই টাকা দিয়ে সরকারি বন্ড কেনেন বা ফিক্সড ডিপোজিট করেন, তবে বছর শেষে আপনি একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ পাবেন। যখন সুদের হার ৫% বা ৬% হয়, তখন সোনা ধরে রাখার ‘সুযোগ ব্যয়’ অনেক বেড়ে যায়। অর্থাৎ, সোনা ধরে রাখা মানে আপনি নিশ্চিত ৫% লাভ ছেড়ে দিচ্ছেন। এই কারণে উচ্চ সুদের হারের জামানায় সোনার আকর্ষণ কমে যায়। কিন্তু যখন সুদের হার শূন্যের কোঠায় বা খুব নিচে থাকে (যেমনটা ছিল ২০২০ সালে কোভিডের সময় বা ২০০৮ সালের মন্দার সময়), তখন সোনা ধরে রাখার কোনো লোকসান নেই, কারণ ব্যাংকে টাকা রেখেও কোনো লাভ হচ্ছে না। এই সময়েই সোনার দাম রকেটের গতিতে বাড়তে থাকে।
প্রকৃত সুদের হারের গোলকধাঁধা (Real Interest Rate):
বিনিয়োগকারীরা কেবল ব্যাংকের ঘোষিত সুদের হার বা ‘নমিনাল রেট’ দেখেন না; তারা দেখেন ‘রিয়েল ইন্টারেস্ট রেট’ বা প্রকৃত সুদের হার। প্রকৃত সুদের হার হলো ব্যাংকের সুদের হার থেকে মুদ্রাস্ফীতির হার বিয়োগ করার পর যা অবশিষ্ট থাকে। ধরুন, ব্যাংক আপনাকে ৫% সুদ দিচ্ছে, কিন্তু দেশে মুদ্রাস্ফীতি চলছে ৮%। এর মানে হলো, ব্যাংকে টাকা রেখে আপনি আসলে বছরে ৩% ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছেন (৫% – ৮% = -৩%)। একে বলা হয় ‘নেগেটিভ রিয়েল রেট’। এই অবস্থায় সোনা হলো বিনিয়োগের সেরা মাধ্যম। কারণ কাগজের টাকা ব্যাংকে রাখলে তার মান কমছে, কিন্তু সোনা মুদ্রাস্ফীতির সাথে পাল্লা দিয়ে তার মান ধরে রাখে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, যখনই প্রকৃত সুদের হার নেগেটিভ জোনে চলে যায়, তখনই সোনার একচেটিয়া আধিপত্য দেখা যায়। পক্ষান্তরে, যদি মুদ্রাস্ফীতি কমে ২% এ আসে এবং ব্যাংক সুদ দেয় ৫%, তবে প্রকৃত সুদ দাঁড়ায় ৩% (পজিটিভ)। এই অবস্থায় মানুষ সোনা বিক্রি করে ব্যাংকে টাকা রাখতে বেশি পছন্দ করে।
কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (QE) বনাম টাইটেলিং (QT):
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কেবল সুদের হার দিয়েই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে না, তারা ‘মানি সাপ্লাই’ বা টাকার যোগান দিয়েও বাজার প্রভাবিত করে। যখন অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়ে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রচুর পরিমাণে টাকা ছাপিয়ে বাজার থেকে সরকারি বন্ড কিনতে শুরু করে। একে বলা হয় ‘কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং’ (QE)। এর ফলে বাজারে নগদ টাকার বন্যা বয়ে যায় এবং ডলারের মান কমে যায়। অতিরিক্ত টাকার যোগান সব ধরণের সম্পদের দাম বাড়িয়ে দেয়, যার মধ্যে সোনা অন্যতম। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা এবং ২০২০ সালের করোনা মহামারীর সময় ফেড ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ছাপিয়েছিল, যার সরাসরি প্রভাবে সোনার দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। আবার যখন অর্থনীতি চাঙ্গা হয়, তখন ব্যাংকগুলো বাজার থেকে টাকা তুলে নেয় বা বন্ড বিক্রি করা বন্ধ করে দেয়, একে বলা হয় ‘কোয়ান্টিটেটিভ টাইটেলিং’ (QT)। কিউটি (QT) শুরু হলে বাজারে তারল্য সংকট দেখা দেয় এবং সোনার দাম চাপের মুখে পড়ে।
ফেডের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মন্দার ভয়:
মাঝেমধ্যে অর্থনীতির সাধারণ সূত্রগুলো কাজ করে না। যেমন—সুদের হার বাড়ানো সত্ত্বেও সোনার দাম বাড়তে দেখা যায়। এর কারণ হলো ‘ফেডের প্রতি অনাস্থা’ বা মন্দার ভয়। যখন বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে বা সুদের হার এত বেশি বাড়াচ্ছে যে অর্থনীতিতে ধস নামবে (Recession), তখন তারা উচ্চ সুদ উপেক্ষা করেও সোনা কিনে রাখেন। একে বলা হয় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ (Stagflation) পরিস্থিতি—যেখানে একই সাথে মুদ্রাস্ফীতি বেশি থাকে আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়। সত্তরের দশকে আমেরিকায় যখন স্ট্যাগফ্লেশন দেখা দিয়েছিল, তখন সুদের হার আকাশচুম্বী হওয়া সত্ত্বেও সোনার দাম বহুগুণ বেড়েছিল। বর্তমানেও আমরা মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতি দেখি, যেখানে সুদের হার বাড়ার খবরেও সোনার দাম কমে না, কারণ বাজার মনে করে এই উচ্চ সুদ দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং শীঘ্রই অর্থনীতিকে বাঁচাতে আবার সুদ কমাতে বা টাকা ছাপাতে হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক জুয়া খেলাই স্বর্ণবাজারের অস্থিরতার মূল কারণ।
মুদ্রাস্ফীতি ও ডিফ্লেশন (অর্থনীতির রক্ষাকবচ)
মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সেরা ‘হেজ’ বা রক্ষাকবচ:
অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে সোনাকে সব সময় ‘ইনফ্লেশন হেজ’ (Inflation Hedge) হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু কেন? সহজ কথায়, মুদ্রাস্ফীতি হলো এমন একটি অবস্থা যখন বাজারে জিনিসের দাম বেড়ে যায় এবং টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ধরুন, আজ আপনি ১০০ টাকা দিয়ে ৫ কেজি চাল কিনতে পারছেন, কিন্তু এক বছর পর মুদ্রাস্ফীতির কারণে ১০০ টাকায় হয়তো ৪ কেজি চাল পাবেন। অর্থাৎ, আপনার টাকার মান কমে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের পরিসংখ্যান বলে, সোনার ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না। বরং উল্টোটা ঘটে। যখন বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, তখন সোনার দামও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। এর কারণ হলো, বিনিয়োগকারীরা জানেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো চাইলেই যত খুশি টাকা ছাপাতে পারে, কিন্তু তারা চাইলেই সোনা তৈরি করতে পারে না। সোনার যোগান সীমিত। তাই যখন বাজারে কাগুজে টাকার বন্যা বয়ে যায় এবং জিনিসের দাম বাড়ে, তখন মানুষ তাদের সম্পদ রক্ষা করতে টাকা বদলে সোনা কিনে রাখে। একে বলা হয় ‘ক্রয়ক্ষমতা সংরক্ষণ’ (Preservation of Purchasing Power)। দীর্ঘমেয়াদে দেখা গেছে, ডলার বা ইউরো তাদের মূল্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে, কিন্তু সোনা তার মূল্য ধরে রেখেছে।
সত্তরের দশকের শিক্ষা: তেলের সংকট ও স্বর্ণের উল্লম্ফন:
মুদ্রাস্ফীতির সময় সোনার পারফরম্যান্স বোঝার জন্য ১৯৭০-এর দশকের দিকে তাকানো সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। সেই সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করে আকাশচুম্বী হয়ে যায়, যা আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করে। একই সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়, বেকারত্ব বাড়ে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ (Stagflation)। তখন আমেরিকার শেয়ার বাজার এবং বন্ড মার্কেটে ধস নামে। বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনা হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। ১৯৭০ সালে সোনার দাম ছিল আউন্স প্রতি ৩৫ ডলার, যা ১৯৮০ সালের শুরুতে বেড়ে ৮৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকে। অর্থাৎ মাত্র এক দশকে সোনার দাম বেড়েছিল ২৪ গুণ! এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, যখন মানুষ তাদের সরকার বা মুদ্রার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন তারা পাগলের মতো সোনা সংগ্রহ করতে থাকে। বর্তমানেও যখন আমেরিকা বা ইউরোপে মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়ে, তখন আমরা সত্তরের দশকের সেই ছায়া দেখতে পাই এবং সোনার দাম বাড়তে শুরু করে।
ডিফ্লেশন বা মূল্যহ্রাস: মুদ্রার উল্টো পিঠ:
মুদ্রাস্ফীতির ঠিক বিপরীত অবস্থা হলো ডিফ্লেশন (Deflation), যখন জিনিসের দাম কমে যায় এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। সাধারণ যুক্তিতে মনে হতে পারে, ডিফ্লেশনের সময় টাকার মান বাড়ে, তাই সোনার দাম কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে সোনা ডিফ্লেশনের সময়েও ভালো পারফর্ম করতে পারে। এর সেরা উদাহরণ হলো ১৯৩০-এর দশকের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দা। সেই সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছিল এবং মানুষ তাদের জমানো টাকা ফেরত পাচ্ছিল না। আর্থিক ব্যবস্থা বা ‘ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম’ ভেঙে পড়ার ভয়ে মানুষ তখন ব্যাংকের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং সোনা কিনে নিজেদের কাছে রাখতে শুরু করে। অর্থাৎ, ডিফ্লেশনের সময় সোনা কেবল মুদ্রাস্ফীতির রক্ষাকবচ নয়, বরং এটি ‘কাউন্টারপার্টি রিস্ক’ (Counterparty Risk) বা ব্যাংক ফেইল করার ঝুঁকির বিরুদ্ধে বিমা হিসেবে কাজ করে। যখন অর্থনীতিতে চরম মন্দা দেখা দেয় এবং সুদের হার শূন্যের নিচে চলে যায়, তখন নগদ টাকা ধরে রাখার চেয়ে সোনা ধরে রাখা বেশি লাভজনক মনে হয়।
হাইপারইনফ্লেশন: যখন টাকা আবর্জনা হয়:
মুদ্রাস্ফীতির চরম পর্যায় হলো হাইপারইনফ্লেশন (Hyperinflation)। আধুনিক যুগে জিম্বাবুয়ে বা ভেনেজুয়েলার মতো দেশে আমরা দেখেছি কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি কয়েক হাজার শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। সেখানে এক বস্তা টাকা দিয়েও এক প্যাকেট বিস্কুট কেনা সম্ভব ছিল না। স্থানীয় মুদ্রা বা কারেন্সি তখন আক্ষরিক অর্থেই আবর্জনায় পরিণত হয়। এই ধরনের চরম পরিস্থিতিতে সোনা হয়ে ওঠে একমাত্র গ্রহণযোগ্য মুদ্রা। যাদের কাছে সামান্য পরিমাণ সোনা ছিল, তারা সেই সোনা বিক্রি করে বা বিনিময় করে বেঁচে থাকতে পেরেছে, বা দেশ ত্যাগ করতে পেরেছে। হাইপারইনফ্লেশনের সময় সোনার দাম স্থানীয় মুদ্রায় কোটি কোটি গুণ বেড়ে যায়। এটি একটি চরম উদাহরণ হলেও, এটি বিনিয়োগকারীদের মনে করিয়ে দেয় যে, কোনো ফিয়াট কারেন্সি বা সরকারি মুদ্রা চিরস্থায়ী নয়। এই ভীতি বা ‘ডুমসডে সিনারিও’ (Doomsday Scenario) সব সময়ই স্বর্ণবাজারের এক কোণে সুপ্ত থাকে এবং দামকে সাপোর্ট দেয়।
মুদ্রাস্ফীতির প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা:
বিনিয়োগকারীরা সব সময় বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যতের কথা বেশি ভাবেন। সোনার দাম বাড়ার জন্য বাস্তবে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি হওয়ার প্রয়োজন নেই; কেবল ‘মুদ্রাস্ফীতি হতে পারে’—এই প্রত্যাশাই (Inflation Expectation) যথেষ্ট। যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমায় বা বাজারে প্রচুর টাকা ছাড়ে, তখন স্মার্ট বিনিয়োগকারীরা ধরে নেন যে ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। এই আগাম সতর্কবার্তা পেয়েই তারা সোনা কেনা শুরু করেন। একে বলা হয় ‘বাই দ্য রিউমার, সেল দ্য নিউজ’ (Buy the rumor, sell the news)। অর্থাৎ, গুজব বা সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে কেনা। আবার যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর হাতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার বার্তা দেয়, তখন সোনার দাম কমে যায়। তাই স্বর্ণবাজারের গতিবিধি বুঝতে হলে কেবল বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির হার দেখলেই হবে না, বরং আগামী ১ বছর বা ৫ বছরে মুদ্রাস্ফীতি কোথায় যেতে পারে—বিনিয়োগকারীদের সেই প্রত্যাশাটি বুঝতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ ও ফিজিক্যাল গোল্ড (রাশিয়া ও চীনের দাবার চাল)
বিক্রেতা থেকে ক্রেতা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভোলবদল:
বিগত দুই দশক আগেও বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভূমিকা ছিল আজকের ঠিক উল্টো। ১৯৯০-এর দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো (যেমন: যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস) তাদের ভল্টে রাখা টন টন সোনা বিক্রি করে দিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল—সোনা অলস সম্পদ, এটি কোনো সুদ দেয় না, তাই এটি বিক্রি করে ডলার বা ইউরো বন্ড কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার পর এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ২০১০ সাল থেকে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সম্মিলিতভাবে ‘নেট বায়ার’ বা নিট ক্রেতায় পরিণত হয়। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (WGC) তথ্যমতে, ২০২২ এবং ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ সোনা কিনেছে, যা গত ৫৫ বছরের ইতিহাস ভেঙে দিয়েছে। এই ভোলবদলের প্রধান কারণ হলো ডলারের ওপর অতি-নির্ভরতা কমানো এবং নিজেদের রিজার্ভ বা সঞ্চয়কে বৈচিত্র্যময় (Diversify) করা। তারা বুঝতে পেরেছে যে, বিপদের দিনে কেবল কাগুজে মুদ্রা বা বন্ড যথেষ্ট নয়, সত্যিকারের সম্পদ বা ‘হার্ড অ্যাসেট’ প্রয়োজন। এই প্রাতিষ্ঠানিক কেনাকাটা সোনার বাজারের জন্য একটি বিশাল সাপোর্ট বা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সোনা বিক্রি করে দেয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সেই সোনা কিনে দামের পতন ঠেকিয়ে রাখে।
ডলারের অস্ত্রায়ন ও রাশিয়ার শিক্ষা (Weaponization of Dollar):
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নতুন পরিভাষা চালু হয়েছে—‘ডলারের অস্ত্রায়ন’। আমেরিকা যখন রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাজেয়াপ্ত বা ‘ফ্রিজ’ করে দেয়, তখন সারা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে যায়। এটি ছিল আধুনিক অর্থনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এই ঘটনাটি চীন, ভারত, ব্রাজিল, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা ছিল। তারা বুঝতে পারে যে, তাদের কষ্টার্জিত রিজার্ভ যদি মার্কিন ডলারে বা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে রাখা হয়, তবে যেকোনো রাজনৈতিক মতবিরোধের জেরে আমেরিকা তা এক নিমিষে বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এই ‘কাউন্টারপার্টি রিস্ক’ বা প্রতিপক্ষের ঝুঁকি এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো সোনা। কারণ, সোনা যদি আপনার নিজের দেশের ভল্টে থাকে, তবে কোনো বিদেশি শক্তি তা ডিজিটাল কায়দায় ফ্রিজ করতে পারবে না। একে বলা হয় ‘স্যাংশন-প্রুফ অ্যাসেট’ বা নিষেধাজ্ঞামুক্ত সম্পদ। এই ভীতি থেকেই গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন ডলার বিক্রি করে ধাপে ধাপে সোনা কিনছে, যা বিশ্ববাজারে সোনার দীর্ঘমেয়াদী চাহিদাকে উসকে দিচ্ছে।
চীনের ড্রাগন ক্ষুধা: পিবিওসি-র (PBoC) গোপন কৌশল:
বর্তমানে স্বর্ণবাজারের সবচেয়ে বড় রহস্যময় খেলোয়াড় হলো চীন। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা পিপলস ব্যাংক অব চায়না (PBoC) গত কয়েক বছর ধরে টানা প্রতি মাসে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। সরকারিভাবে তারা যে পরিমাণ সোনার কথা ঘোষণা করে, বিশ্লেষকদের ধারণা বাস্তবে তাদের কাছে তার চেয়ে অনেক বেশি সোনা মজুদ আছে। চীনের এই আগ্রাসী সোনা কেনার পেছনে দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, তাদের বিপুল পরিমাণ রিজার্ভ (প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার) মূলত মার্কিন ডলারে রাখা আছে, যা তাদের জন্য একটি বড় কৌশলগত দুর্বলতা। তারা এই ঝুঁকি কমাতে চায়। দ্বিতীয়ত, চীন তাদের নিজস্ব মুদ্রা ‘ইউয়ান’ বা ‘রেনমিনবি’-কে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কোনো মুদ্রাকে বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য করতে হলে তার পেছনে শক্তিশালী স্বর্ণের মজুদ থাকা জরুরি, যা সেই মুদ্রার ওপর আস্থা তৈরি করে। চীন জানে যে, ভবিষ্যতে যদি তাইওয়ান নিয়ে আমেরিকার সাথে তাদের সংঘাত হয়, তবে ডলার তাদের জন্য নিরাপদ নয়। তাই তারা এখন থেকেই ‘ফিজিক্যাল গোল্ড’ বা দৃশ্যমান সোনা সরিয়ে নিচ্ছে লন্ডন বা নিউইয়র্ক থেকে নিজেদের দেশে। এই বিশাল চীনা চাহিদা সোনার দামের বড় একটি চালিকাশক্তি।
ভারত ও তুরস্ক: সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাফার:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার তালিকায় ভারত এবং তুরস্কের নামও ওপরের দিকে থাকে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) নিয়মিত বাজার থেকে সোনা কিনে তাদের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। ভারতের অর্থনীতির ভিত্তি কিছুটা দুর্বল এবং আমদানি নির্ভর হওয়ার কারণে তাদের মুদ্রার (রুপি) মান প্রায়ই ওঠানামা করে। এই অস্থিরতা সামাল দিতে সোনা একটি ‘বাফার’ বা শক-এবজরবার হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, তুরস্কের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে তীব্র মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়েছে। তাদের মুদ্রা ‘লিরা’র মান তলানিতে ঠেকেছে। এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সাধারণ জনগণ উভয়েই সোনা কিনছে। তুরস্ক বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম স্বর্ণ ক্রেতা দেশ। যখন কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বাজারের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে, তখন সেই বাজারে ধস নামা কঠিন। এই দেশগুলো মূলত সোনার দাম কমলে (Dip) কেনাকাটা বাড়িয়ে দেয়, যা বাজারের জন্য একটি ‘ফ্লোর প্রাইস’ বা সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করে দেয়।
সার্বভৌম সম্পদ ও জাতীয় নিরাপত্তা:
সোনা এখন আর কেবল অর্থনৈতিক পণ্য নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ বা ‘সার্বভৌম সম্পদ’ (Sovereign Asset)। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যেমন দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ করত শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য, বর্তমানের অর্থনৈতিক যুদ্ধের যুগে দেশগুলো সোনা মজুদ করছে আর্থিক স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য। পোল্যান্ড বা হাঙ্গেরির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোও এখন তাদের সোনা ইংল্যান্ডের ব্যাংক (Bank of England) থেকে ফিরিয়ে এনে নিজেদের দেশে রাখছে। তাদের বক্তব্য হলো—‘সোনা জাতীয় আস্থার প্রতীক, এটি নিজের কাছে থাকাই শ্রেয়।’ এই যে সোনাকে ‘রিপ্যাট্রিয়েশন’ (Repatriation) বা স্বদেশে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা, এটি নির্দেশ করে যে বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশনের যুগ শেষ হয়ে আসছে এবং আমরা একটি খণ্ডিত বা মেরুকরণকৃত বিশ্বে প্রবেশ করছি। এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় কাগজের চুক্তির চেয়ে ধাতব সোনার মূল্য এবং বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি। যতদিন ভূ-রাজনৈতিক অবিশ্বাস থাকবে, ততদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই স্বর্ণতৃষ্ণা কমবে না, বরং বাড়তেই থাকবে।
কাগজের সোনা বনাম আসল সোনা (ইটিএফ ও ফিউচার মার্কেট)
দৃশ্যমান বনাম অদৃশ্য: কাগজের সোনার রাজত্ব:
সাধারণ মানুষের ধারণা, সোনার দাম নির্ধারিত হয় বুঝি স্বর্ণের দোকান বা খনি থেকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্ববাজারে সোনার দামের ওপর আসল বা ‘ফিজিক্যাল গোল্ড’-এর চেয়ে ‘কাগজের সোনা’ বা ‘পেপার গোল্ড’-এর প্রভাব অনেক বেশি। পেপার গোল্ড বলতে বোঝায় এমন সব আর্থিক চুক্তি বা দলিল (যেমন: ফিউচার কন্ট্রাক্ট, অপশনস, ইটিএফ), যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা সোনা না কিনেই সোনার দামের ওপর বাজি ধরেন। লন্ডন বা নিউইয়র্কের বাজারে প্রতিদিন যে পরিমাণ সোনার লেনদেন হয়, তার ৯৫ শতাংশেরও বেশি হলো এই পেপার গোল্ড। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাস্তবে পৃথিবীতে যতটুকু সোনা আছে, তার চেয়ে অন্তত ১০০ গুণ বেশি পরিমাণের ‘কাগজের সোনা’ বাজারে লেনদেন হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতি ১ আউন্স আসল সোনার বিপরীতে বাজারে হয়তো ১০০ আউন্সের বাজি বা চুক্তি ঘুরপাক খাচ্ছে। এই বিশাল ফাটকাবাজি বা ‘স্পেকুলেশন’-এর কারণেই সোনার দাম অনেক সময় আসল চাহিদা ও যোগানের সূত্র মেনে চলে না। হঠাৎ করে দাম পড়ে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রায়শই এই অদৃশ্য বাজারের হাত থাকে।
ইটিএফ (ETF): শেয়ার বাজারের সোনার খনি:
স্বর্ণ বিনিয়োগের আধুনিক এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ‘গোল্ড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড’ বা ইটিএফ (ETF)। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো আমেরিকার ‘SPDR Gold Shares’ (GLD)। ইটিএফ হলো এমন একটি ফান্ড যা শেয়ার বাজারে সাধারণ শেয়ারের মতো কেনাবেচা করা যায়, কিন্তু এর পেছনে আসল সোনা জমা থাকে। যখন বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করেন সোনার দাম বাড়বে, তখন তারা ভল্টে সোনা কিনে রাখার ঝামেলায় না গিয়ে ইটিএফ-এর ইউনিট কিনে নেন। যখন ইটিএফ-এর চাহিদা বাড়ে, তখন ফান্ডের ম্যানেজারদের বাজার থেকে সমপরিমাণ আসল সোনা কিনে ভল্টে রাখতে হয়, যা বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়িয়ে দেয়। আবার যখন বিনিয়োগকারীরা ইটিএফ বিক্রি করে দেন (ликুইডেশন), তখন ফান্ডের ম্যানেজারদের সেই সোনা বাজারে বিক্রি করে দিতে হয়, ফলে দাম পড়ে যায়। ২০১৩ সালে সোনার দামে যে বিশাল ধস নেমেছিল, তার প্রধান কারণ ছিল ইটিএফ থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা বিক্রি বা ‘আউটফ্লো’। তাই আধুনিক স্বর্ণবাজারের পালস বুঝতে হলে ইটিএফ-এর ইনফ্লো (টাকা আসা) এবং আউটফ্লো (টাকা যাওয়া)-এর দিকে নজর রাখা জরুরি।
ফিউচার মার্কেট ও কমেক্স (COMEX): যেখানে আসল খেলা হয়:
বিশ্ববাজারে সোনার দাম মূলত আবিষ্কৃত বা ‘প্রাইস ডিসকভারি’ হয় নিউইয়র্কের কমোডিটি এক্সচেঞ্জ বা ‘কমেক্স’ (COMEX)-এ। এটি একটি ফিউচার মার্কেট। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতারা ভবিষ্যতের একটি নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট দামে সোনা কেনাবেচার চুক্তি করেন। মজার ব্যাপার হলো, এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর খুব কম মানুষই (১ শতাংশের কম) আসলে সোনা বুঝে নেন বা ডেলিভারি নেন। তারা কেবল দামের পার্থক্য বা লাভ-লোকসান নগদে বুঝে নিয়ে চুক্তি শেষ করে দেন। এই বাজারে ‘লেভারেজ’ বা ঋণের সুবিধা পাওয়া যায়। অর্থাৎ, আপনার কাছে যদি ১ লাখ টাকা থাকে, তবে আপনি ব্রোকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ১০ বা ২০ লাখ টাকার সোনার ওপর বাজি ধরতে পারেন। এই লেভারেজের কারণেই ফিউচার মার্কেটে সামান্য টাকার প্রবাহ সোনার দামে বড় ধরনের তোলপাড় সৃষ্টি করতে পারে। যখন বড় বড় হেজ ফান্ডগুলো সম্মিলিতভাবে মনে করে দাম কমবে, তারা ফিউচার মার্কেটে বিশাল আকারের ‘সেল অর্ডার’ দেয়, যা নিমেষেই সোনার দামকে নিচে নামিয়ে আনতে পারে।
শর্ট সেলিং ও ম্যানিপুলেশন: ফাটকাবাজির অন্ধকার দিক:
শেয়ার বাজারের মতো স্বর্ণবাজারেও ‘শর্ট সেলিং’ করা যায়। শর্ট সেলিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একজন ট্রেডার বাজি ধরেন যে সোনার দাম কমবে। তিনি ব্রোকারের কাছ থেকে সোনা ধার নিয়ে বর্তমান দামে বিক্রি করে দেন এবং পরে দাম কমলে সেই সোনা কম দামে কিনে ব্রোকারকে ফেরত দিয়ে মাঝখানের টাকা লাভ করেন। এই প্রক্রিয়ায় কৃত্রিমভাবে বাজারে সোনার যোগান বাড়িয়ে দেওয়া হয় (কাগজে-কলমে), ফলে দাম কমে যায়। অনেক সময় বড় বড় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ‘স্পুফিং’ (Spoofing) নামক বেআইনি কৌশলের আশ্রয় নেয়। তারা হাজার হাজার ভুয়া সেল অর্ডার দিয়ে বাজারে ভয় ছড়িয়ে দেয় যে দাম কমছে, তারপর আসল দাম কমলে তারা নিচ থেকে সোনা কিনে নেয়। জেপি মর্গান (JP Morgan)-এর মতো বিশ্বের অন্যতম বড় ব্যাংকে এই ধরনের ম্যানিপুলেশনের দায়ে কয়েক বছর আগে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সোনার বাজার সব সময় স্বচ্ছ থাকে না; বড় খেলোয়াড়রা চাইলেই স্বল্প সময়ের জন্য দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
মূল্যের বিভ্রান্তি: স্পট প্রাইস বনাম ফিজিক্যাল প্রিমিয়াম:
মাঝেমধ্যে আমরা বাজারে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি দেখি, যাকে বলা হয় ‘ডিসকানেক্ট’ বা সংযোগ বিচ্ছিন্নতা। যখন অর্থনৈতিক সংকট খুব তীব্র হয় (যেমন ২০২০ সালের মার্চ মাসে কোভিডের শুরুতে), তখন ফিউচার মার্কেটে বা পেপার গোল্ডের দাম হু হু করে কমতে থাকে, কারণ ট্রেডাররা তাদের লোকসান কাটাতে সবকিছু বিক্রি করে নগদ টাকা সংগ্রহ করতে চান। কিন্তু একই সময়ে আসল সোনার কয়েন বা বারের দোকানে লম্বা লাইন পড়ে যায় এবং সেখানে সোনার সংকট দেখা দেয়। তখন দেখা যায়, স্ক্রিনে সোনার দাম হয়তো আউন্স প্রতি ১৭০০ ডলার, কিন্তু আপনি যদি দোকান থেকে ১ আউন্স কয়েন কিনতে যান, আপনাকে দিতে হচ্ছে ১৯০০ বা ২০০০ ডলার। এই অতিরিক্ত দামকে বলা হয় ‘প্রিমিয়াম’। অর্থাৎ, পেপার মার্কেটের দাম সব সময় আসল বা ফিজিক্যাল মার্কেটের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। যখন পেপার মার্কেট ক্র্যাশ করে কিন্তু ফিজিক্যাল ডিমান্ড বেশি থাকে, তখন বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কম দামে সোনা কিনে নেন। কারণ তারা জানেন, শেষ পর্যন্ত আসল সোনার দামই টিকবে, কাগজের চুক্তি নয়।
সাংস্কৃতিক ও মৌসুমি চাহিদা (ভারত ও চীনের উৎসব)
‘লাভ ট্রেড’ বনাম ‘ফিয়ার ট্রেড’: পূর্বের আধিপত্য:
বিশ্ব স্বর্ণবাজারকে প্রধানত দুটি মনস্তাত্ত্বিক ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো পশ্চিমা বিশ্বের ‘ফিয়ার ট্রেড’ বা ভয়ের বাণিজ্য (যা আমরা আগের পর্বগুলোতে আলোচনা করেছি—যুদ্ধ, মন্দা বা ডলারের পতন নিয়ে ভয়), আর অন্যটি হলো এশিয়ার ‘লাভ ট্রেড’ বা ভালোবাসার বাণিজ্য। এই লাভ ট্রেডের মূল চালিকাশক্তি হলো ভারত এবং চীন। এই দুই দেশ মিলে বিশ্বের মোট বার্ষিক স্বর্ণের চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। এখানকার মানুষের কাছে সোনা কেবল একটি ধাতু বা বিনিয়োগ নয়; এটি তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামাজিক মর্যাদোর্জন। পশ্চিমে যখন সোনা কেনা হয় ব্যাংকের ভল্টে রাখার জন্য, পূর্বে সোনা কেনা হয় গায়ে পরার জন্য বা উপহার দেওয়ার জন্য। এই বিশাল ফিজিক্যাল বা দৃশ্যমান চাহিদা বিশ্ববাজারে সোনার দামের একটি ‘ফ্লোর’ বা নিম্নসীমা নির্ধারণ করে দেয়। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে, তখন ভারত ও চীনের ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন, ফলে দাম আর বেশি নিচে নামতে পারে না।
ভারতীয় বিয়ে: এক বিশাল অর্থনৈতিক যজ্ঞ:
ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। আর ভারতীয় সংস্কৃতিতে সোনা ছাড়া বিয়ের কথা কল্পনাও করা যায় না। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি পরিবার তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কনের জন্য সোনার গয়না কেনে। হিন্দু শাস্ত্রমতে, বিয়ের সময় কনেকে দেওয়া সোনাকে বলা হয় ‘স্ত্রীধন’ (Stridhan), যা বিপদের দিনে নারীর একমাত্র নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়। পরিসংখ্যান বলছে, একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত ভারতীয় বিয়েতে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম সোনা কেনা হয়। আর উচ্চবিত্ত পরিবারের বিয়েতে তা কয়েক কেজিতে পৌঁছায়। এই বিশাল চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে সাধারণত সেপ্টেম্বর মাস থেকে (যখন বিয়ের মৌসুম শুরু হয়) সোনার দাম বাড়তে শুরু করে এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তা চাঙ্গা থাকে। যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা চলে, তখনও ভারতীয় বিয়ের বাজারে ভাটা পড়ে না। এই ধারাবাহিক চাহিদা স্বর্ণবাজারকে বড় ধরনের ধস থেকে রক্ষা করে।
উৎসবের রঙ: দীপাবলি ও ধনতেরাস:
ভারতের স্বর্ণ চাহিদার ক্যালেন্ডারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো অক্টোবর ও নভেম্বর মাস। এই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় দীপাবলি (Diwali) এবং ধনতেরাস (Dhanteras) উৎসব। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, ধনতেরাসের দিন সোনা কিনলে লক্ষ্মী দেবী প্রসন্ন হন এবং সারা বছর পরিবারে সমৃদ্ধি বজায় থাকে। এই একদিনেই ভারতে কয়েক হাজার টন সোনা কেনাবেচা হয়, যা অনেক ছোট দেশের বার্ষিক রিজার্ভের চেয়েও বেশি। এছাড়াও এপ্রিল-মে মাসে ‘অক্ষয় তৃতীয়া’ (Akshaya Tritiya) নামের আরেকটি উৎসব আছে, যে দিনটি সোনা কেনার জন্য অত্যন্ত শুভ মনে করা হয়। এই নির্দিষ্ট দিনগুলোকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে বড় ধরনের নড়াচড়া বা ‘স্পাইক’ (Spike) দেখা যায়। ট্রেডাররা আগে থেকেই জানেন যে এই সময়ে চাহিদা বাড়বে, তাই তারা উৎসবের এক-দু মাস আগে থেকেই পজিশন নিতে শুরু করেন, যা দামকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়।
গ্রামীণ অর্থনীতি ও বর্ষাকালের সমীকরণ:
ভারতের স্বর্ণের বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ চাহিদা আসে গ্রামীণ এলাকা বা কৃষকদের কাছ থেকে। ভারতের গ্রামীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি সহজলভ্য নয়, তাই কৃষকরা তাদের ফসলের লভ্যাংশ ব্যাংকে না রেখে সোনা কিনে রাখেন। তাদের কাছে সোনা হলো ‘লিকুইড ক্যাশ’ বা তরল টাকা, যা যেকোনো সময় বিক্রি করে বীজ বা সার কেনা যায়। এখানে একটি মজার আবহাওয়াগত সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের কৃষি মূলত মৌসুমি বৃষ্টিপাত বা ‘মনসুন’ (Monsoon)-এর ওপর নির্ভরশীল। যদি জুন-জুলাই মাসে ভালো বৃষ্টি হয়, তবে বাম্পার ফলন হয় এবং কৃষকদের হাতে প্রচুর টাকা আসে। তখন অক্টোবর-নভেম্বর মাসে সোনার চাহিদা বেড়ে যায়। আর যদি খরা বা বন্যা হয়, তবে গ্রামীণ চাহিদা কমে যায় এবং বিশ্ববাজারেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক স্বর্ণ বিশ্লেষকরা ভারতের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখেন।
চীনের নববর্ষ ও ‘গোল্ডেন উইক’:
চীনের স্বর্ণ চাহিদার ধরণ ভারতের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, কিন্তু পরিমাণে কম নয়। তাদের প্রধান উৎসব হলো ‘লুনার নিউ ইয়ার’ বা চীনা নববর্ষ, যা সাধারণত জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়ে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা ছোটদের এবং প্রিয়জনদের সোনার কয়েন, বার বা গয়না উপহার দেন। বিশেষ করে চীনা রাশিচক্র বা ‘জোডিয়াক’ (Zodiac) অনুযায়ী প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীর (যেমন: ড্রাগন, বাঘ, খরগোশ) ছবি খোদাই করা সোনার বার বিক্রি হয়। ড্রাগন বা বাঘের বছরে জন্মহার বেশি থাকে এবং সোনার চাহিদাও তুঙ্গে থাকে। এছাড়া অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহকে চীনে বলা হয় ‘গোল্ডেন উইক’ (Golden Week)। এই ছুটিতে কোটি কোটি মানুষ কেনাকাটা করেন এবং সোনা তাদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকে। চীনের তরুণ প্রজন্ম, যারা আগে হীরের দিকে ঝুঁকছিল, তারা এখন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আবার ঐতিহ্যবাহী ২৪ ক্যারেট সোনার গয়না বা ছোট সোনার দানা (Gold Beans) জমানোর দিকে ঝুঁকছে। এই সাংস্কৃতিক প্রত্যাবর্তন সোনার দীর্ঘমেয়াদী চাহিদাকে ধরে রেখেছে।
মৌসুমী প্যাটার্ন বা সিজনালিটি:
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বর্ণবাজারে একটি পরিষ্কার মৌসুমী প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত বছরের মাঝামাঝি সময়ে (জুন-আগস্ট) সোনার দাম কিছুটা কম থাকে বা স্থিতিশীল থাকে, যাকে বলা হয় ‘সামার ডলড্রামস’ (Summer Doldrums)। কিন্তু আগস্টের শেষ দিক থেকে বা সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে দাম বাড়তে থাকে। কারণ তখন ভারতের উৎসব ও বিয়ের মৌসুমের জন্য জুয়েলারি প্রস্তুতকারকরা বিশ্ববাজার থেকে সোনা কেনা শুরু করেন। এরপর জানুয়ারিতে চীনা নববর্ষের চাহিদার কারণে দাম আবার বাড়ে। অর্থাৎ, আপনি যদি বিনিয়োগকারী হন, তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী জুন-জুলাই মাস হলো সোনা কেনার সেরা সময় এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস হলো বিক্রির সেরা সময়। এই সাইকেল বা চক্রটি প্রতি বছরই কমবেশি কাজ করে, যদি না বড় কোনো যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় সেই হিসাব উল্টে দেয়।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস (ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল গোল্ডের চ্যালেঞ্জ)
বিটকয়েন বনাম সোনা: সিংহাসনের লড়াই:
গত এক দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর মধ্যে একটি হলো—বিটকয়েন কি সোনার জায়গা দখল করে নিচ্ছে? অনেক প্রযুক্তিপ্রেমী বিনিয়োগকারী বিটকয়েনকে ‘ডিজিটাল গোল্ড’ বা ‘গোল্ড ২.০’ বলে অভিহিত করেন। তাদের যুক্তি হলো, সোনার মতোই বিটকয়েনও দুষ্প্রাপ্য (২১ মিলিয়নের বেশি বিটকয়েন তৈরি করা সম্ভব নয়), এটি কোনো সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এবং এটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পাঠানো যায়। পরিসংখ্যান বলছে, তরুণ প্রজন্মের বিনিয়োগকারীরা (Millennials এবং Gen Z) এখন আর ভল্টে সোনা রাখতে আগ্রহী নন; তারা তাদের সঞ্চয় বিটকয়েন বা ইথালিয়ামে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই প্রবণতা স্বর্ণবাজারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, বিনিয়োগের একটি বিশাল অংশ যা আগে সোনার বাজারে আসত, তা এখন ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে চলে যাচ্ছে। জেপি মর্গানের মতো বড় ব্যাংকগুলোও স্বীকার করেছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের পোর্টফোলিওতে সোনার বরাদ্দ কমিয়ে বিটকয়েনের বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। যদি বিটকয়েন দীর্ঘমেয়াদে মূল্যের ভাণ্ডার বা ‘স্টোর অফ ভ্যালু’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে, তবে সোনার একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব হতে পারে এবং দামের প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে।
অস্থিরতা বনাম স্থায়িত্ব: সংকটের পরীক্ষায় কে এগিয়ে?
যদিও বিটকয়েনকে সোনার বিকল্প ভাবা হয়, কিন্তু সংকটের সময় এই দুই সম্পদের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সোনা হলো হাজার বছরের পরীক্ষিত স্থিতিশীল সম্পদ, যেখানে বিটকয়েন অত্যন্ত অস্থির বা ‘ভোলাটাইল’। ২০২১ এবং ২০২২ সালে যখন শেয়ার বাজার ধসে পড়েছিল এবং সুদের হার বাড়ছিল, তখন দেখা গেছে বিটকয়েনও প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারের (যেমন: টেসলা বা অ্যাপল) মতোই আচরণ করেছে এবং এর দাম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে সোনা তার মূল্য ধরে রাখতে বা সামান্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ, বিটকয়েন এখনো একটি ‘রিস্ক অ্যাসেট’ (Risk Asset) বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে কাজ করে, ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে নয়। যখন বিনিয়োগকারীরা ভয় পান, তারা এখনো বিটকয়েন বিক্রি করে সোনার দিকেই ছোটেন। তাই বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিটকয়েন হয়তো সোনার মুনাফার কিছু অংশ খেয়ে ফেলছে, কিন্তু এটি এখনো সোনার স্থায়িত্বের বিকল্প হতে পারেনি। যতক্ষণ ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের এই বন্য ওঠানামা বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ রক্ষণশীল বিনিয়োগকারীরা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনার ওপরই ভরসা রাখবে।
ব্লকচেইন ও টোকেনাইজড গোল্ড: নতুনের ছোঁয়ায় পুরাতন:
প্রযুক্তি কেবল সোনার শত্রু নয়, মিত্রও বটে। ব্লকচেইন প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ‘টোকেনাইজড গোল্ড’ (Tokenized Gold)-এর প্রচলন শুরু হয়েছে। প্যাক্স গোল্ড (PAXG) বা টিথার গোল্ড (XAUT)-এর মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলো প্রতিটি টোকেনের পেছনে ১ আউন্স বা ১ গ্রাম আসল সোনা জমা রাখে। এর ফলে সাধারণ মানুষ এখন ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ নিরাপদ উপায়ে সোনা কিনতে ও বেচতে পারেন। আগে সোনা কিনতে গেলে ভল্ট ভাড়া নেওয়া, বিমার খরচ এবং পরিবহনের ঝামেলা পোহাতে হতো। কিন্তু টোকেনাইজেশনের ফলে এখন ১ ডলার দিয়েও সোনার ভগ্নাংশ কেনা সম্ভব। এটি স্বর্ণবাজারের তারল্য বা ‘লিকুইডিটি’ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রযুক্তির কারণে সোনার বাজার এখন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে লেনদেন করা যায়। ভবিষ্যতে এই ‘ডিজিটাল ফিজিক্যাল গোল্ড’ সোনার চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, কারণ এটি নতুন প্রজন্মের কাছে সোনাকে আরও সহজলভ্য এবং আকর্ষণীয় করে তুলছে।
সিবিডিসি (CBDC) ও স্বর্ণ-সমর্থিত ডিজিটাল মুদ্রা:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন তাদের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা বা ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি’ (CBDC) চালুর কাজ করছে। এর মধ্যে চীন (ডিজিটাল ইউয়ান) এবং ভারত (ডি-রুপি) অনেকটা এগিয়ে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ খবর হলো, ব্রিকস (BRICS) জোট বা রাশিয়ার নেতৃত্বে কিছু দেশ ডলারের বিকল্প হিসেবে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা করছে, যার পেছনে স্বর্ণের রিজার্ভ বা ‘গোল্ড ব্যাকিং’ থাকবে। যদি সত্যিই এমন কোনো মুদ্রা চালু হয় যা সরাসরি সোনার সাথে যুক্ত, তবে বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা অকল্পনীয় হারে বেড়ে যাবে। কারণ, তখন সেই মুদ্রার মান বজায় রাখতে দেশগুলোকে হাজার হাজার টন সোনা কিনে রিজার্ভে রাখতে হবে। এটি হবে অনেকটা ১৯৭১ সালের আগের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ যুগে ফিরে যাওয়ার মতো, তবে ডিজিটাল মোড়কে। এই সম্ভাবনাটি সোনার দামের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় ‘বুলিশ’ বা ইতিবাচক ফ্যাক্টর হতে পারে।
প্রজন্মের ব্যবধান ও ভবিষ্যতের পোর্টফোলিও:
সোনার দামের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে ‘গ্রেট ওয়েলথ ট্রান্সফার’ বা প্রজন্মের সম্পদ স্থানান্তরের ওপর। আগামী দুই দশকে বেবি বুমার বা বয়োজ্যেষ্ঠ প্রজন্ম তাদের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ তাদের সন্তানদের কাছে হস্তান্তর করবেন। এই নতুন প্রজন্ম যদি মনে করে সোনা একটি ‘বর্বর যুগের ধাতু’ (Relic of the past) এবং বিটকয়েনই ভবিষ্যৎ, তবে সোনার বাজার সংকুচিত হতে পারে। কিন্তু স্মার্ট মানি বা অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, ভবিষ্যৎ হবে ‘হাইব্রিড’। অর্থাৎ, একজন বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওতে সোনা এবং বিটকয়েন—উভয়ই থাকবে। সোনা থাকবে সম্পদ রক্ষার জন্য (Insurance), আর বিটকয়েন থাকবে সম্পদ বৃদ্ধির জন্য (Growth)। এই দুইয়ের সহাবস্থানই আগামী দিনের অর্থনীতির চিত্র। তবে, যদি কখনো ইন্টারনেটের বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে বা সাইবার যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ডিজিটাল গোল্ড বা বিটকয়েন অকেজো হয়ে পড়তে পারে, কিন্তু ফিজিক্যাল গোল্ড বা আসল সোনা তখনো তার উজ্জ্বলতা হারাবে না। এই চূড়ান্ত নিরাপত্তার অনুভূতিই সোনাকে প্রযুক্তির যুগেও প্রাসঙ্গিক করে রাখবে।
কখন কিনবেন, কখন বেচবেন?
ভিড়ের বিপরীতে চলা: কন্ট্রারিয়ান ইনভেস্টিং (Contrarian Investing):
বিনিয়োগের জগতে সবচেয়ে সফল কৌশল হলো ‘কন্ট্রারিয়ান’ হওয়া বা স্রোতের বিপরীতে চলা। ওয়ারেন বাফেটের বিখ্যাত উক্তি—”বি ফিয়ারফুল হোয়েন আদার্স আর গ্রিডি, অ্যান্ড বি গ্রিডি হোয়েন আদার্স আর ফিয়ারফুল” (Be fearful when others are greedy, and be greedy when others are fearful)—সোনা কেনার ক্ষেত্রেও ১০০ শতাংশ প্রযোজ্য। সাধারণ মানুষ বা অনভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা তখনই সোনা কিনতে ছোটেন যখন দাম আকাশচুম্বী হয় এবং খবরের কাগজে হেডলাইন হয় যে ‘সোনা নতুন রেকর্ড করেছে’। একে বলা হয় ‘ফোমো’ (FOMO – Fear Of Missing Out)। কিন্তু স্মার্ট বিনিয়োগকারীরা ঠিক উল্টোটা করেন। যখন সোনার বাজার ঠান্ডা থাকে, কেউ সোনা নিয়ে কথা বলে না বা দাম কয়েক মাস ধরে নিম্নমুখী থাকে (Consolidation Phase)—তখনই হলো সোনা কেনার বা ‘অ্যাকুমুলেশন’ (Accumulation) করার সেরা সময়। মনে রাখবেন, সোনা একটি দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ। আপনি যদি দাম বাড়ার পরে কেনেন, তবে আপনার লাভের সম্ভাবনা কমে যায়। তাই যখন সবাই হতাশ হয়ে সোনা বিক্রি করছে, তখনই আপনাকে ধীরে ধীরে কেনা শুরু করতে হবে।
কখন কিনবেন: কৌশলগত সময় এবং সিজনালিটি:
টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস বা চার্ট না বুঝেও আপনি কেবল ক্যালেন্ডার দেখে সোনা কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যেমনটি আমরা অষ্টম পর্বে আলোচনা করেছি, সোনা কেনার জন্য বছরের সেরা সময় হলো জুন এবং জুলাই মাস। এই সময়ে সাধারণত ভারত ও চীনে উৎসবের চাহিদা থাকে না এবং পশ্চিমা বিশ্বেও গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে লেনদেন কম হয়। ফলে দাম প্রায়ই বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। এছাড়া, যখন আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানোর ঘোষণা দেয় এবং ডলার শক্তিশালী হয়, তখন সোনার দাম সাময়িকভাবে কমে যায় (Dip)। এই ‘ডিপ’ বা পতনগুলোই হলো কেনাকাটার সুবর্ণ সুযোগ। আপনার পুরো টাকা দিয়ে একবারে সোনা না কিনে ‘ডলার কস্ট এভারেজিং’ (Dollar Cost Averaging) বা ডিসিএ পদ্ধতিতে কেনা উচিত। অর্থাৎ, প্রতি মাসে বা প্রতি তিন মাসে অল্প অল্প করে সোনা কিনলে আপনার গড় ক্রয়মূল্য (Average Buying Price) অনেক কমে আসবে এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
কখন বেচবেন: ইউফোরিয়া বা উত্তেজনার মুহূর্ত:
সোনা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া কেনা চেয়েও কঠিন। কারণ মানুষ সোনা মায়া বা আবেগের বশবর্তী হয়ে ধরে রাখে। কিন্তু বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো মুনাফা বা প্রফিট বুকিং। কখন বেচবেন? যখন দেখবেন আপনার আশেপাশের সবাই—যাদের সাথে শেয়ার বাজারের কোনো সম্পর্ক নেই, যেমন ট্যাক্সি ড্রাইভার, বাসের যাত্রী বা সেলুনের নাপিত—সোনা কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন বা সোনা নিয়ে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন। একে বলা হয় ‘ককটেল পার্টি থিওরি’। যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ‘ইউফোরিয়া’ বা অতি-উত্তেজনা দেখা দেয়, তখন বুঝতে হবে বাজার তার সর্বোচ্চ চূড়ায় (Top) পৌঁছে গেছে। এটিই বিক্রি করার বা অন্তত কিছু মুনাফা ঘরে তোলার সেরা সময়। এছাড়া, যখন দেখবেন বিশ্ব অর্থনীতি আবার স্বাভাবিক হয়ে আসছে, সুদের হার কমছে না এবং শেয়ার বাজার বা রিয়েল এস্টেট খাত খুব ভালো করছে, তখন সোনা কিছুটা বিক্রি করে অন্য খাতে বিনিয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে মনে রাখবেন, আপনার মোট সোনার ১০০ শতাংশ কখনোই বিক্রি করা উচিত নয়; অন্তত ১০-২০ শতাংশ সব সময় ‘বিমা’ হিসেবে রেখে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: গয়না বনাম বার/কয়েন (মজুরির ফাঁদ):
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সোনা কিনলেও ভুল পদ্ধতিতে কেনেন। তারা মূলত গয়না বা জুয়েলারি কেনেন। কিন্তু বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে গয়না কেনা একটি বাজে সিদ্ধান্ত। কারণ, গয়না কেনার সময় আপনাকে সোনার দামের সাথে ১০ থেকে ২০ শতাংশ, কখনো কখনো ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ‘মজুরি’ বা মেকিং চার্জ দিতে হয়। আবার যখন আপনি সেই গয়না বিক্রি করতে যাবেন, দোকানদার সেই মজুরি তো ফেরত দেবেনই না, উল্টো সোনার দাম থেকেও আরও ১০-১৫ শতাংশ কেটে রাখবেন ( খাদ বা অপচয় হিসেবে)। অর্থাৎ, আপনি কেনার দিনই প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ লোকসানে শুরু করছেন। সোনার দাম যদি ভবিষ্যতে ৪০ শতাংশ না বাড়ে, তবে আপনি ব্রেক-ইভেন বা আসল টাকাও ফেরত পাবেন না। তাই আপনি যদি খাঁটি বিনিয়োগ করতে চান, তবে গয়না না কিনে ‘গিনি’, ‘বার’ বা ‘কয়েন’ কিনুন। হলমার্ক করা (Hallmarked) ২৪ ক্যারেট বা ২২ ক্যারেটের বার বা কয়েনে মজুরি খুব কম থাকে এবং বিক্রির সময় প্রায় পুরো দামই পাওয়া যায়। এটিই বাংলাদেশে সোনা বিনিয়োগের সঠিক উপায়।
পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট: গোলরক্ষকের ভূমিকা:
সোনাকে ফুটবলের স্ট্রাইকার ভাববেন না, যে আপনাকে রাতারাতি ধনী বানিয়ে দেবে বা প্রচুর গোল (মুনাফা) করবে। সোনা হলো আপনার দলের গোলরক্ষক বা ডিফেন্ডার। যখন শেয়ার বাজার বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ গোল খেয়ে বসে (ধস নামে), তখন সোনা আপনার দলকে বাঁচিয়ে দেয়। একজন আদর্শ বিনিয়োগকারীর মোট সম্পদের (Total Net Worth) ৫ থেকে ১০ শতাংশ সোনায় থাকা উচিত। যদি আপনি খুব রক্ষণশীল হন বা মন্দার ভয় পান, তবে তা বাড়িয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ করতে পারেন। কিন্তু এর বেশি নয়। কারণ সোনা কোনো নিয়মিত আয় দেয় না। আপনার পোর্টফোলিওতে শেয়ার, বন্ড, রিয়েল এস্টেট এবং নগদ টাকার পাশাপাশি সোনা থাকলে—যেকোনো অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন। একে বলা হয় ‘অল ওয়েদার পোর্টফোলিও’ (All Weather Portfolio)।

আমরা এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা দেখলাম, সোনা কেবল একটি চকচকে হলুদ ধাতু নয়; এটি মানবসভ্যতার অর্থনীতির একটি আয়না। ভূ-রাজনীতি, যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের দাপট এবং মানুষের ভয় ও লোভের এক জটিল সমীকরণে সোনার দাম নির্ধারিত হয়। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল ক্রিপ্টোকারেন্সির যুগেও সোনা তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি, বরং প্রতিবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন ট্রিলিয়ন ডলারের নোট ছাপিয়ে কাগজের মুদ্রার মান কমিয়ে দিচ্ছে, তখন সোনা চুপচাপ এক কোণে দাঁড়িয়ে তার মালিকের ক্রয়ক্ষমতা পাহারা দিচ্ছে। এটি হয়তো আপনাকে রাতারাতি কোটিপতি বানাবে না, কিন্তু এটি নিশ্চিত করবে যে—আপনি যেন হঠাৎ করে নিঃস্ব না হয়ে যান। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পৃথিবীতে, যেখানে সরকার বদলায়, মুদ্রার রং বদলায়, এবং অর্থনীতির নিয়ম বদলায়—সেখানে সোনা হলো একমাত্র ধ্রুবক। তাই বুঝে-শুনে, সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে সোনা কেনা কেবল বিলাসিতা নয়, এটি আপনার এবং আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্থিক সুরক্ষার চাবিকাঠি।
লেখক
এবিএম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক, glive24.com