সেমিকন্ডাক্টর খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্প কেবল একটি উৎপাদনখাত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য উপাদান। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলকের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে দ্রুত বিস্তৃত এই শিল্পে দক্ষ প্রকৌশলী ও গবেষকের ঘাটতি বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। জনসংখ্যাগত সুবিধা, বিপুল সংখ্যক প্রকৌশল শিক্ষার্থী এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দ্রুত অগ্রগতির কারণে দেশটি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে। তবে সফল হতে হলে তিনটি মূল বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে—দৃঢ় শিক্ষাগত ভিত্তি, সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং প্রকল্পভিত্তিক বাস্তব অভিজ্ঞতা।

শিক্ষার্থীদের করণীয়

প্রথমত, নির্দিষ্ট ট্র্যাক নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ভিএলএসআই, ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন, অ্যানালগ/মিক্সড-সিগন্যাল বা পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স—এসবের মধ্যে যেকোনো একটি ক্ষেত্রে গভীর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। একসঙ্গে সব শেখার চেষ্টা না করে বিশেষায়িত হওয়াই সফলতার চাবিকাঠি।

দ্বিতীয়ত, মৌলিক জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য। সেমিকন্ডাক্টর ফিজিকস, সিএমওএস প্রযুক্তি, ভিএলএসআই ডিজাইন পদ্ধতি, পাইথন প্রোগ্রামিং ও লিনাক্স পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, প্রকল্পভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরটিএল ব্লক ডিজাইন, সিমুলেশন রিপোর্ট প্রস্তুত, প্রযুক্তিগত ডকুমেন্টেশন তৈরি এবং গিটহাবের মতো প্ল্যাটফর্মে কাজ প্রকাশ—এসব আন্তর্জাতিক চাকরি বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে ওপেন-সোর্স টুলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ছোট আকারের চিপ ডিজাইন ফ্লো সম্পন্ন করতে পারছে, যা এক দশক আগেও প্রায় অসম্ভব ছিল। সিজিপিএ নয়, বরং বাস্তব প্রকল্পই এই শিল্পে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রধান খাত ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

নিচের সারণিতে শিল্পের চারটি প্রধান স্তর এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থান তুলে ধরা হলো—

খাতকার্যক্রমবাংলাদেশের সম্ভাবনাপ্রয়োজনীয় সম্পদ ও বিনিয়োগলক্ষ্য
চিপ ডিজাইন (ফ্যাবলেস)আরটিএল ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন, অ্যানালগ/মিক্সড-সিগন্যালউচ্চ; দ্রুত প্রবেশযোগ্যতুলনামূলক কম; সফটওয়্যার ও দক্ষ মানবসম্পদআইসি ডিজাইন ও সিস্টেম সমাধান
টেস্টিং ও প্যাকেজিং (ওএসএটি/এটিপি)চিপ টেস্টিং, প্যাকেজিংমধ্যম; কর্মসংস্থানে সম্ভাবনাময়মাঝারি বিনিয়োগ; প্রযুক্তিগত দক্ষতাদ্রুত শিল্প সম্প্রসারণ
ডিভাইস ও প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিংফটোলিথোগ্রাফি, ডিপোজিশন, এচিংনিম্ন; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজনঅত্যধিক; বিলিয়ন ডলারের ফ্যাবউচ্চপ্রযুক্তি অবকাঠামো
ইকুইপমেন্ট ও ম্যাটেরিয়াললিথোগ্রাফি সিস্টেম, সিলিকন ওয়েফারসীমিতঅত্যধিক বিনিয়োগ ও গবেষণাবিশেষায়িত প্রযুক্তি উন্নয়ন

বাংলাদেশের করণীয়

পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ফ্যাব স্থাপন বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত নয়, কারণ এতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন। তাই স্বল্পমেয়াদে চিপ ডিজাইন ও টেস্টিং খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হবে কৌশলগতভাবে যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক গবেষণা ল্যাব, পাইলট লাইন এবং প্রোটোটাইপিং সুবিধা স্থাপন জরুরি। শিল্প ও একাডেমিয়ার সমন্বয়ে ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা ও উদ্ভাবনী প্রকল্প চালু করলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।

সঠিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দক্ষ প্রকৌশলী তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে পারে। এটি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা নিশ্চিত করবে।