,

সেতু নির্মাণে অনিয়ম, এলজিইডির তিনজন সাময়িক বরখাস্ত

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বাসাইলে সেতু নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তিন কর্মকর্তা–কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দুজন এবং টাঙ্গাইলের বাসাইলের একজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও দায়িত্বে কার কী ধরনের গাফিলতি ছিল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বুধবার এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সই করা পৃথক আদেশে এসব প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা জানানো হয়। আদেশে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বেগমগঞ্জে স্ল্যাব ও রেলিংয়ের রড নিয়ে অভিযোগ

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিং তৈরিতে নির্ধারিত রড ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নির্মাণাধীন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব পা দিয়ে আঘাত করলেই ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে উঠে আসে।

এরপর এলজিইডির বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম ও কার্যসহকারী মো. মহিন উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আদেশে জানানো হয়েছে।

শুধু মাঠপর্যায়ের দুই কর্মীর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একই ঘটনায় নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মন্ডল এবং বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনছুর আহমেদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাঁদের লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।

অভিযোগের প্রকৃত কারণ এবং নির্মাণকাজ তদারকিতে কার কী ধরনের দায়িত্ব ছিল, তা নির্ধারণে এলজিইডির নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

বাসাইলে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ

টাঙ্গাইলের বাসাইলের ঘটনাটি আরও ভিন্ন ধরনের অভিযোগ সামনে এনেছে। সেখানে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরির সময় রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের কার্যসহকারী মো. হাসমত আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এলজিইডি। সংস্থাটির আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে হাসমত আলীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাসাইলের একই ঘটনায় এর আগে সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পাশাপাশি টাঙ্গাইলের নির্বাহী প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলীর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ওই নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এবার নতুন আদেশে কার্যসহকারী হাসমত আলীকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

তদারকি ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে

দুটি ঘটনায় শুধু নির্মাণকাজে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা নয়, প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহির বিষয়টিও সামনে এসেছে। কারণ একটি সেতুর নির্মাণকাজে নির্ধারিত উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নোয়াখালীর ঘটনায় দুই কর্মকর্তা–কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন দুই প্রকৌশলীর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাসাইলে উপসহকারী প্রকৌশলীর পর কার্যসহকারী বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে দুই প্রকল্পের নির্মাণপ্রক্রিয়া, তদারকি এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় এসেছে।

নির্মাণকাজে উপকরণের মান ও নির্ধারিত নকশা অনুসরণ না হলে প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সেতুর মতো অবকাঠামো সরাসরি মানুষের চলাচল ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তদন্তের ফলের দিকে নজর

এলজিইডির নেওয়া সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্তে অভিযোগের ধরন, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব এবং তাঁদের ব্যাখ্যা পর্যালোচনার পর পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বেগমগঞ্জের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন সাত কর্মদিবসের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, উন্নয়নকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষ্য, জনগণের অর্থের অপব্যবহার কিংবা মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলার সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। পদ-পদবি বা প্রভাবের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এ ঘটনায় শোকজ, সাময়িক বরখাস্ত ও বদলির মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে চাকরি থেকে অব্যাহতির মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।

এখন দুই সেতু প্রকল্পের তদন্তে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র কতটা উঠে আসে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা–কর্মচারীদের দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারিত হয়, সেটিই দেখার বিষয়। তদন্ত প্রতিবেদন ও কারণ দর্শানোর জবাবের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।