নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পূর্বমুহূর্তে একটি ভোটকেন্দ্রে গভীর রাতে ব্যালট পেপার খোলা এবং তাতে অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘিরে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলের ধনকুন্ডা পপুলার হাইস্কুল কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনতা ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
Table of Contents
ঘটনার সূত্রপাত ও অভিযোগের প্রকৃতি
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বিএনপি নেতাদের দাবি অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যায় প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সহায়তায় একদল ব্যক্তি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ব্যালট পেপার সংবলিত বাক্স খুলে তাতে সিল মারার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক মমতাজ উদ্দিন জানান, তিনি পোলিং এজেন্টদের তথ্য দিতে কেন্দ্রে গেলে তাকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তিনি জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করলে মেঝেতে এলোপাতাড়ি পড়ে থাকা ব্যালট বই এবং ১০-১২ জন বহিরাগত নারী-পুরুষকে দেখতে পান।
আসনটির বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান অভিযোগ করেন, কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. বশিরুল হক ভূঁইয়া মূলত জামায়াতে ইসলামীর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটির সাবেক আমির। তাঁর প্রত্যক্ষ মদতেই রাতের অন্ধকারে নির্বাচনী কারচুপির নীল নকশা সাজানো হচ্ছিল।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নির্বাচনী এলাকা | নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জের একাংশ) |
| কেন্দ্রের নাম | ধনকুন্ডা পপুলার হাইস্কুল, গোদনাইল |
| অভিযুক্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা | মো. বশিরুল হক ভূঁইয়া (স্কুল শিক্ষক) |
| অভিযোগের ধরন | রাতে ব্যালট পেপার খোলা ও অনধিকার প্রবেশ |
| রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা | বশিরুল হক (সাবেক থানা আমির, জামায়াত) |
| প্রশাসনের বক্তব্য | নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে ব্যালট গণনা করা হচ্ছিল |
| বর্তমান পরিস্থিতি | সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণে পরিস্থিতি স্থিতিশীল |
প্রশাসনের ব্যাখ্যা ও বিতর্কিত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে উপস্থিত হন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহীনা ইসলাম চৌধুরী এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনী প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে ব্যালট পেপারের সংখ্যা মিলিয়ে দেখা হচ্ছিল এবং সেখানে কোনো প্রকার জাল ভোট বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক রায়হান কবিরের বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন যে বশিরুল হক ভূঁইয়ার সাথে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, তবে তাকে একজন স্কুল শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে তার বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়নি। যদিও জামায়াতে ইসলামীর নারায়ণগঞ্জ মহানগর আমির মাওলানা আবদুল জব্বার নিশ্চিত করেছেন যে বশিরুল হক একসময় দলটির সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দায়িত্বে ছিলেন।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনা
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জামায়াত নেতা মো. আমান বিষয়টিকে ‘মিথ্যা প্রোপাগান্ডা’ বলে দাবি করলেও স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ কাটছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ভোটকক্ষের মেঝেতে ব্যালট বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যাওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে স্বচ্ছ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উত্তেজনার এক পর্যায়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা কেন্দ্রের চারপাশ ঘিরে ফেলেন এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কড়া নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
