অস্ট্রেলিয়ার সাংস্কৃতিক রাজধানী সিডনির বুকে এক মায়াবী সন্ধ্যায় বাংলার লোকজ সুর আর পাশ্চাত্য সঙ্গীতের এক অপূর্ব মেলবন্ধন প্রত্যক্ষ করলেন প্রবাসী বাঙালি ও স্থানীয় সুধীজন। গত রোববার ব্যাংকসটাউনের ঐতিহ্যবাহী ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটারে ‘জলের গান’ ব্যান্ডের দুই কাণ্ডারি রাহুল আনন্দ ও কনক আদিত্যর পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের বিমোহিত করে। অনুষ্ঠানের সবচেয়ে চমকপ্রদ মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন রাহুল আনন্দের বাঁশির সুরের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের লিবারেল পার্টির প্রভাবশালী নেত্রী ও সংসদ সদস্য ওয়েন্ডি লিন্ডসে।
সুরের ভাষায় একীভূত দুই মহাদেশ
মঞ্চে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওয়েন্ডি লিন্ডসে। রাহুল আনন্দ তাকে মঞ্চে আহ্বান জানালে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তিনি বলেন, “আমি তোমাদের ভাষা জানি না, কিন্তু এই সুরে যে মাটির টান আছে, তা আমি হৃদয়ে অনুভব করতে পারছি।” এরপর কোনো বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গ ছাড়াই কেবল রাহুল আনন্দের মায়াবী বাঁশির সুরের ওপর ভিত্তি করে তিনি গেয়ে শোনান অস্ট্রেলীয় কিংবদন্তি শিল্পী ওয়েন্ডি ম্যাথিউজের কালজয়ী গান ‘অ্যাজ জেন্টল টাইডস গো রোলিং বাই’। বিদেশের মাটিতে বাংলার বাঁশিতে বিলেতি সুরের এই সংমিশ্রণ পুরো মিলনায়তনে পিনপতন নীরবতা ও মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়।
মাটির বাদ্যযন্ত্রে লোকজ সুরের মূর্ছনা
রাহুল আনন্দ সবসময়ই তার উদ্ভাবনী বাদ্যযন্ত্রের জন্য পরিচিত। সিডনির এই মঞ্চেও তিনি তার নিজ হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র—শুকতারা, মমতা, ঘুঙুর ও মন্দিরা নিয়ে হাজির হন। তার সঙ্গে লোকজ সুরের এই যাত্রায় গিটার ও কাহনে সঙ্গ দেন সিডনির স্থানীয় ব্যান্ড ‘রক ক্যাসেট’-এর তানভির আহসান ও অমিত দাশ। পারকাশন ও ঢোলে চারু ব্যান্ডের নামিদ ফারহান এবং শঙ্খ ও করতালের তালে লিন্টাস প্যারেরা ও রহমান রে পুরো পরিবেশনাটিকে জীবন্ত করে তোলেন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ দিকগুলো এক নজরে নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিশেষত্ব | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রধান শিল্পী | রাহুল আনন্দ ও কনক আদিত্য (জলের গান) |
| বিশেষ অতিথি | ওয়েন্ডি লিন্ডসে (অস্ট্রেলীয় সংসদ সদস্য) |
| ভেন্যু | ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটার, ব্যাংকসটাউন, সিডনি |
| নতুন গান | ‘ঝুকুর ঝুক’ (প্রথমবারের মতো লাইভ পরিবেশনা) |
| বাদ্যযন্ত্র | শুকতারা, মমতা, বাঁশি, ঢোল, শঙ্খ, খঞ্জনি ও মন্দিরা |
| আয়োজক | সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন ‘চাঁদের হাট’ |
নতুন সৃষ্টি ‘ঝুকুর ঝুক’ ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ
এই অনুষ্ঠানটির মাধ্যমেই ‘জলের গান’-এর একদম নতুন সৃষ্টি ‘ঝুকুর ঝুক’ গানটি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে পরিবেশিত হয়। ট্রেনের ছন্দের সঙ্গে গ্রামীণ বাংলার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠা এই গানটি শুনে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন।
অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়েছিল সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন ‘চাঁদের হাট’-এর আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে। আয়োজক ফাহাদ আসমা জানান, চাঁদের হাট মূলত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে। সম্পূর্ণ ক্রাউড ফান্ডিং বা গণ-তহবিলের মাধ্যমে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের লভ্যাংশ দুস্থ ও বিপদগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ব্যয় করা হবে।
শিল্পী কনক আদিত্য তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা সিডনিসহ অস্ট্রেলিয়ার চারটি শহরে গান ও গল্পের ডালা নিয়ে এসেছি। এখানকার মানুষের ভালোবাসা এবং আমাদের লোকজ সংস্কৃতির প্রতি তাদের টান আমাদের অভিভূত করেছে।” দর্শক সারিতে থাকা পূরবী পারমিতা বোস তার অনুভূতি শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, “প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে রাহুল আনন্দর বাঁশির সুর যেন একপশলা বৃষ্টির মতো প্রাণের তৃষ্ণা মিটিয়ে দিয়ে গেল।”
সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এই অনন্য আয়োজনটি কেবল বিনোদন নয়, বরং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
