ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেন (৫৮) হত্যার ঘটনায় প্রধান হোতাসহ এজাহারভুক্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে জহিরুল ইসলামকে এ ঘটনায় মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁদের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করে সোমবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম সোমবার দুপুরে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সাভারের আমিনবাজার এবং মুন্সীগঞ্জ সদর থানার আওতাধীন লঞ্চঘাট এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে বলে আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জহিরুল ইসলামের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। অন্য আট আসামির প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। আদালত শুনানি শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
গ্রেপ্তার অপর আটজন হলেন—আমিনবাজার এলাকার মোজাম্মেলের ছেলে আলাউদ্দিন (২৬), সামসুলের ছেলে আপন (৩০), সামসুলের ছেলে জিহাদ (২০), মৃত নজরুলের ছেলে ইমরান (২৬), মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে নূর মোহাম্মদ রুদ্র (২৪), মো. বজলু শেখের ছেলে মো. রাকিব মিয়া (২৮), মৃত হালিম মিয়ার ছেলে ছাব্বির আহম্মেদ (২৪) এবং মো. জিন্নত আলীর ছেলে মো. ওয়াসিম (৪০)। র্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে সাভার থানায় তিনটি মাদক মামলা রয়েছে।
অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে বিরোধ
র্যাব ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে সাভারের আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে একটি অটোরিকশা গ্যারেজের মালিককে মারধরের ঘটনা ঘটে।
ঘটনাটি দেখে এর প্রতিবাদ করেন পুলিশের বিশেষ শাখার এসআই আলতাফ হোসেন। এ সময় গ্যারেজ মালিককে মারধরকারীদের সঙ্গে আলতাফ হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুলের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরিস্থিতি একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে হামলাকারীরা আলতাফ হোসেনের ওপরও চড়াও হয়।
পুলিশ সদস্য হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও হামলাকারীরা তাঁকে ছাড়েনি বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং হামলার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে আলতাফ হোসেন দৌড়ে তাঁর ছেলে আরিফুলের কর্মস্থল একটি পোশাক কারখানার ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেন।
এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এজাহার ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা আরও ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগীকে ডেকে আনে। পরে তারা পোশাক কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে এসআই আলতাফ হোসেন এবং তাঁর ছেলে আরিফুলের ওপর হামলা চালানো হয়।
হামলার সময় কারখানার মেশিন ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। এতে কর্মস্থলটির স্বাভাবিক পরিবেশও বিঘ্নিত হয়। একপর্যায়ে স্থানীয়রা গুরুতর আহত বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক এসআই আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
১৫ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা
হামলার ঘটনায় নিহত এসআই আলতাফ হোসেনের স্ত্রী বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা হওয়ার পরপরই জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে পুলিশ। তদন্তের ধারাবাহিকতায় সাভারের আমিনবাজার ও মুন্সীগঞ্জের লঞ্চঘাট এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে এজাহারভুক্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা এখন গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঘটনার পেছনের কারণ, হামলায় কার কী ভূমিকা ছিল এবং এজাহারে নাম থাকা অন্য আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে হামলার সময় উপস্থিত ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগীর পরিচয় ও তাঁদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, আমিনবাজারে পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার যৌথ অভিযানে এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করে সোমবার দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার এভাবে হামলার শিকার হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলাটির তদন্তে গুরুত্ব দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তের পরবর্তী ধাপে ঘটনার কারণ, হামলার পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।










