বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের দীর্ঘদিনের স্ট্রাইকার সংকট কাটাতে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে সামনে এসেছেন মাহি খান। ইংল্যান্ডের নিম্ন বিভাগের ফুটবলে খেলা এই তরুণ ফরোয়ার্ড চলতি মৌসুমে সাত ম্যাচে করেছেন নয়টি গোল। তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে সাফ টুর্নামেন্টের জন্য বাংলাদেশের দলে ডেকেছেন প্রধান কোচ থমাস ডুলি। এখন দেখার বিষয়, ক্লাব ফুটবলে গোল করার এই ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ধরে রাখতে পারেন কি না মাহি।
বাংলাদেশের ফুটবলে নির্ভরযোগ্য গোলদাতার অভাব দীর্ঘদিনের। অন্তত গত আট বছর ধরে একজন কার্যকর স্ট্রাইকার খুঁজতে হচ্ছে জাতীয় দলকে। আক্রমণ গড়ে তোলার পরও সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা কিংবা প্রতিপক্ষের জালে নিয়মিত বল পাঠাতে ব্যর্থ হওয়া—এসব সমস্যা বিভিন্ন সময়ে ভুগিয়েছে দলকে। নতুন কোচ থমাস ডুলিও এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। সেই লক্ষ্যেই এবার তাঁর নজরে এসেছেন ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া মাহি খান।
ইংল্যান্ডের নবম স্তরের লিগে খেলেন মাহি
মাহি বর্তমানে ইংল্যান্ডের মল্টন এফসির হয়ে খেলছেন। তাঁর দল ইউনাইটেড কাউন্টিজ লিগের প্রিমিয়ার ডিভিশন সাউথে অংশ নেয়, যা ইংলিশ ফুটবলের নবম স্তরের প্রতিযোগিতা হিসেবে পরিচিত। এই লিগে খেলেই চলতি মৌসুমে সাত ম্যাচে নয়টি গোল করেছেন তিনি। একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে এমন পারফরম্যান্স তাঁকে জাতীয় দলের নির্বাচকদের বিবেচনায় আসতে সহায়তা করেছে।
মাহির উচ্চতা ১ দশমিক ৮৩ মিটার। শারীরিক এই গড়ন তাঁকে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে দুই প্রান্ত থেকে সতীর্থদের দেওয়া ক্রসে হেডের মাধ্যমে গোল করার ক্ষেত্রে তাঁর উচ্চতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, তিনি শুধু কেন্দ্রীয় স্ট্রাইকার হিসেবেই খেলেন না; দুই উইংয়েও খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ফলে আক্রমণভাগের বিভিন্ন পজিশনে তাঁকে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন কোচ।
অবশ্য ইংল্যান্ডের নিম্ন বিভাগের ক্লাব ফুটবলে গোল করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একই সাফল্য ধরে রাখা এক বিষয় নয়। জাতীয় দলের হয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ সামলানো, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সীমিত সুযোগ কাজে লাগানোর মতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে তাঁকে। তাই সাত ম্যাচে নয়টি গোল আশাব্যঞ্জক হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর কার্যকারিতা প্রমাণের অপেক্ষা রয়েছে।
যুব ফুটবল থেকে সিনিয়র পর্যায়ে
মাহির ফুটবলজীবনের শুরু কেটারিং টাউনের যুব দলে। সেখানে সাত বছর কাটানোর পর ২০২৪ সালে রাশডেন অ্যান্ড হাইয়াম ইউনাইটেডের হয়ে সিনিয়র ফুটবলে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর নিজের ফুটবলজীবন এগিয়ে নেওয়ার পথে বর্তমানে মল্টন এফসির হয়ে খেলছেন এই তরুণ।
বাংলাদেশের জার্সিতে অবশ্য এবারই প্রথম মাঠে নামার সুযোগ পাচ্ছেন না মাহি। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে বাংলাদেশের হয়ে তিনটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। তবে ওই ম্যাচগুলোতে গোল করতে পারেননি। এবার সাফের দলে ডাক পেয়ে নিজের সামর্থ্য প্রমাণের সামনে দাঁড়িয়েছেন এই ফরোয়ার্ড।
মাহিকে নিয়ে কেন ঝুঁকি নিচ্ছেন ডুলি?
মাহিকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোচ থমাস ডুলি নিজেই কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এখনই তাকে দলে নেওয়া অনেকটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মতো। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের যে কাজটি দরকার, সে হয়তো তা করতে পারবে। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি এমনই।’
কোচের এই বক্তব্যে বাংলাদেশের স্ট্রাইকার সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাহির সাম্প্রতিক গোল করার রেকর্ড তাঁকে সুযোগ করে দিলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনও সীমিত। ফলে তাঁকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে একদিকে যেমন সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে তেমনি এটি দলের আক্রমণভাগে নতুন সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টাও।
বাংলাদেশের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য গোলদাতা খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাফের মতো আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াতে হলে শুধু আক্রমণ তৈরি করলেই হবে না, সুযোগগুলোকে গোলে রূপান্তর করতে হবে। একজন কার্যকর স্ট্রাইকার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করতে পারেন এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
মাহি সেই দায়িত্ব কতটা নিতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে। ক্লাব ফুটবলে সাত ম্যাচে নয়টি গোল করে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রাথমিক প্রমাণ দিয়েছেন। এবার জাতীয় দলের হয়ে সেই পারফরম্যান্সের প্রতিফলন ঘটানোই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোচ ডুলির আস্থার প্রতিদান দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের স্ট্রাইকার সংকট কাটাতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড, সেদিকেই নজর থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের।









