রাজধানীর পল্লবীতে বাংলা টিভির প্রতিবেদক প্রান্ত পারভেজের বাসায় ঢুকে গুলি চালানোর ঘটনায় কিশোর গ্যাং ‘ভইরা-দে’ গ্রুপের অন্যতম সহযোগী আতিক ওরফে চোরা আতিককে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পল্লবীর মোহাম্মদিয়া মার্কেট এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
এসআরবির ভাষ্য, গত ১৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পল্লবীর সবুজবাংলা এলাকায় সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বাসায় হামলা চালানো হয়। দুটি মোটরসাইকেলে করে চারজন সশস্ত্র ব্যক্তি তাঁর বাসায় প্রবেশ করে। তারা সেখানে প্রান্তকে খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর পল্লবী থানায় মামলা করেন প্রান্ত পারভেজ। তাঁর বক্তব্যের বরাত দিয়ে এসআরবি জানায়, মিরপুর ও পল্ললীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ‘ভইরা-দে’ গ্রুপের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে।
এসআরবির দাবি, প্রকাশিত সংবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে ‘ভইরা-দে’ গ্রুপের মূল হোতা আশিকের নির্দেশে তাঁর সহযোগীরা সাংবাদিকের বাসায় হামলা ও গুলি চালায়। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে পল্লবীর সবুজবাংলা, বাউনিয়াবাধ, অ্যাভিনিউ-৫ ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের মহড়া দিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করছিলেন।
গ্রেপ্তার আতিকের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানিয়েছে এসআরবি।
সিসিটিভি ও প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত
হামলার পর ঘটনাটি তদন্তে নামে এসআরবির একটি দল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রবিন (২২) নামের এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে পল্লবীর তালতলা বস্তিতে রবিনের বাসায় অভিযান চালানো হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে রবিন পালিয়ে যান।
ওই অভিযানে তাঁর মা ডলি বেগমকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়। এসআরবির দাবি, তাঁর কাছ থেকে ৭৪৫টি ইয়াবা বড়ি এবং ১৫ গ্রাম ইয়াবার গুঁড়া উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক মূল্য ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
পরে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পল্লবীর মোহাম্মদিয়া মার্কেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে মামলার দুই নম্বর আসামি আতিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
আতিকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান
এসআরবি জানিয়েছে, আতিককে জিজ্ঞাসাবাদে রবিন, ইব্রাহিম, শাহিন ওরফে শুটার শাহিন এবং আল আমিনের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের পল্লবীর সেকশন-১১ ও অ্যাভিনিউ-৫ এলাকায় অবস্থানের কথা জানা যায়।
পরে ওই এলাকায় অভিযান চালানো হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরা পালিয়ে যান। তবে একটি টিনের ঘরের পেছন থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি খালি ম্যাগাজিন এবং নয়টি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এসআরবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাংবাদিকের বাসায় হামলার ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পৃথক অভিযানে নিলয় সুজন গ্রেপ্তার
মঙ্গলবার রাতে পল্লবীতে পৃথক একটি অভিযানে অন্য একটি কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য নিলয় সুজনকে (৩১) গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি-৪। তাঁর কাছ থেকে ছয়টি মুঠোফোন, দুটি ধারালো রামদা এবং এক পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও অপরাধী চক্রের তৎপরতার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
কারাগার থেকে পালানো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার
এদিকে আরেক অভিযানে মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পলাতক আসামি সোহেল রানাকে (৩৮) গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি-৪। ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কারারক্ষীদের আহত করে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান সোহেল। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাব বিলুপ্ত, কার্যক্রম এসআরবির অধীনে
অভিযানগুলোর খবর এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। মঙ্গলবার সরকার ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-২০২৬’ আইনের প্রজ্ঞাপন গেজেটে প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন এসআরবি নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট চালু করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় র্যাবের সংশ্লিষ্ট জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে থাকা অর্থ, দায়-দেনা, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাব বই, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র এবং সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র এসআরবির কাছে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর ও ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে।
ফলে র্যাবের বিদ্যমান জনবল ও সম্পদের ধারাবাহিকতা রেখে নতুন সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে এসআরবির কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।









