আজ ১৯ মার্চ—বাংলাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী, লেখিকা ও শিক্ষাবিদ নাশিদ কামাল-এর জন্মদিন। ১৯৫৮ সালের এই দিনে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই গুণী ব্যক্তিত্বকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
সংগীত যেন তাঁর রক্তেই প্রবাহিত। তিনি কিংবদন্তি লোকসংগীত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর বড় নাতনি। পারিবারিক ঐতিহ্যের সেই সুরধারায় বেড়ে ওঠা নাশিদ কামাল পরবর্তীতে নজরুলসংগীতের একজন বিশিষ্ট শিল্পী হিসেবে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। তাঁর সুরেলা কণ্ঠ, শুদ্ধ পরিবেশনা ও গভীর অনুভব শ্রোতাদের হৃদয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছে। নজরুলসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৯ সালে “নজরুল পুরস্কার” এবং ২০১৪ সালে “নজরুল পদক” লাভ করেন।
তাঁর পারিবারিক পরিচয়ও সমানভাবে গৌরবময়। পিতা মোস্তফা কামাল ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং মা হুসনে আরা কামাল ছিলেন কবি, অধ্যাপিকা ও সমাজসেবী। মাত্র দুই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি এই মাটিতেই গড়ে তোলেন তাঁর শিকড়।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে আলাদা করে তোলে। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিশুশিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন করে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ পি. সি. গোমেজ, ওস্তাদ আখতার সাদমানি, ওস্তাদ কাদের জামিরী এবং পণ্ডিত যশরাজ-এর মতো গুণীজনের কাছে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন উজ্জ্বল। হলিক্রস গার্লস হাইস্কুল ও হলিক্রস কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন এবং স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর কানাডার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
পেশাগত জীবনেও তাঁর অবদান বহুমাত্রিক। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ICDDR,B-এ কাজ করার পাশাপাশি তিনি UNFPA-এর উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশ ও সুদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর গবেষণাপত্র বিশ্বখ্যাত জার্নাল The Lancet-এ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়-এর ব্র্যাক বিজনেস স্কুলে অধ্যাপনা করছেন।
সংগীতের বাইরেও তিনি একজন সাবলীল উপস্থাপক ও দক্ষ বিতার্কিক। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের “তর্ক যুক্তি তর্ক” অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কার অর্জন তাঁর বহুমুখী প্রতিভারই আরেকটি প্রমাণ।
ব্যক্তিজীবনে তিনি মেজর জেনারেল ও চিকিৎসক আনিস ওয়াইজের সহধর্মিণী। তাঁর পরিবারে রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—চাচা মুস্তাফা জামান আব্বাসী এবং ফুফু ফেরদৌসী রহমান—দুজনেই সংগীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
শিল্প, শিক্ষা ও গবেষণা—এই তিন অঙ্গনে সমান দক্ষতায় অবদান রেখে নাশিদ কামাল নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি এক আলোকবর্তিকা—যিনি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন।
এই বিশেষ দিনে তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও অব্যাহত সাফল্য কামনা করি।
শুভ জন্মদিন, নাশিদ কামাল।
