বাংলা শিশুসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ভোর ৬টা ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরায় জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন এই গুণী সাহিত্যিক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তাঁর প্রয়াণে বাংলা শিশুসাহিত্যের অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে সুকুমার বড়ুয়ার জন্ম। তাঁর পিতা সর্বানন্দ বড়ুয়া ও মাতা কিরণ বালা বড়ুয়া। শৈশব থেকেই শব্দের ছন্দ ও ভাষার খেলায় তাঁর সহজাত আকর্ষণ ছিল। সেই আগ্রহই পরবর্তী সময়ে তাঁকে পরিণত করে শিশু-কিশোর সাহিত্যের এক নিবেদিতপ্রাণ কারিগরে। জীবনের কর্মজীবনে তিনি ছিলেন বিনয়ী ও নীরব সাধক। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় এবং দীর্ঘ সেবার পর ১৯৯৯ সালে স্টোরকিপার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যচর্চা কখনো থেমে থাকেনি।
প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি ছড়া লিখেছেন অবিরাম নিষ্ঠা ও আনন্দ নিয়ে। ‘কচি-কাঁচার আসর’, ‘খেলাঘর’, ‘মুকুলের মাহফিল’সহ দেশের নামকরা শিশু-কিশোর পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা। তাঁর ছড়ায় ছিল সহজ ভাষা, প্রাণবন্ত কল্পনা ও শিশুমনের স্বাভাবিক কৌতূহলের অনুপম প্রকাশ। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশু পাঠকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন প্রিয় এক নাম।
সুকুমার বড়ুয়ার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের সংখ্যা বিপুল। ‘লেজ আবিষ্কার’, ‘ছোটদের হাট’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বেড়াল’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াসম্ভার’ (দুই খণ্ড)সহ অসংখ্য বই বাংলা শিশুসাহিত্যের ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ। তাঁর লেখায় কেবল বিনোদন নয়, নৈতিকতা, কল্পনাশক্তি ও ভাষাবোধের সূক্ষ্ম শিক্ষা নিহিত ছিল।
ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।
সুকুমার বড়ুয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ |
| জন্মস্থান | মধ্যম বিনাজুরি, রাউজান, চট্টগ্রাম |
| কর্মজীবন শুরু | ১৯৬২, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
| অবসর | ১৯৯৯ |
| প্রধান সাহিত্যধারা | শিশু-কিশোর ছড়া |
| একুশে পদক | ২০১৭ |
| মৃত্যু | ২ জানুয়ারি, ভোর ৬টা ৫৫ মিনিট |
| বয়স | ৮৮ বছর |
সুকুমার বড়ুয়ার প্রয়াণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম, ছড়ার আনন্দময় জগৎ ও শিশুদের জন্য রেখে যাওয়া অমূল্য সাহিত্যভাণ্ডার তাঁকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে।
