কণ্ঠে গাঁথা এক জীবন্ত কিংবদন্তি

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এমন কিছু নাম আছে, যেগুলো উচ্চারিত হলেই গর্ব, আবেগ ও ঐতিহ্যের এক গভীর অনুভূতি জেগে ওঠে। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লাইল তেমনই এক অনন্য নাম। তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবন, সাধনার ব্যতিক্রমী ধারা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় রুনা লাইলের স্বামী ও প্রখ্যাত অভিনেতা আলমগীর তাঁর জীবন ও সংগীতচর্চার নানা অজানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ গর্ব করে বলতে পারে—আমাদের একজন রুনা লাইল আছেন।” আলমগীরের মতে, একজন শিল্পীর জীবনে মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানই সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই তিনি স্মরণ করেন বহু বছর আগের একটি ঘটনা, যখন ভারতের একটি পত্রিকায় লেখা হয়েছিল—‘রুনা লাইলাকে আমাদের দিন, আমরা আপনাদের ফারাক্কার পানি দিয়ে দেব।’ আলমগীরের ভাষায়, এ মন্তব্য শুধু জনপ্রিয়তার নয়, বরং শিল্পী হিসেবে রুনা লাইলের অসাধারণ গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ।

অনুষ্ঠানে উঠে আসে তাঁর সংগীতচর্চার ব্যতিক্রমী পদ্ধতির কথাও। আলমগীর জানান, রুনা লাইলকে তিনি কখনো দীর্ঘ সময় ধরে তানপুরা হাতে রেওয়াজ করতে বা আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে সুর মেলাতে দেখেননি। বরং হাঁটতে হাঁটতে, ঘরের কাজ করতে করতে, কাপড় ভাঁজের সময় কিংবা এমনকি বাথরুমেও তিনি গলা সাধনা করেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে রুনা লাইল একবার হেসে বলেছিলেন, “আমার দরকার কণ্ঠকে ঠিক জায়গায় রাখা। এই তানগুলোই আমার রেওয়াজ। জীবনে এত উস্তাদের কাছে শিখেছি যে, এখন সুর আমার কানে বাস করে।”

রুনা লাইলও অনুষ্ঠানে স্বামীর কিছু অভ্যাস নিয়ে রসিকতা করেন। তাঁর ভাষায়, আলমগীর নিজের চুল নিয়ে ভীষণ সচেতন। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা কিংবা লিফটে দাঁড়িয়েও তাঁকে চুল ঠিক করতে দেখা যায়—যা তাঁদের দাম্পত্য জীবনে হাস্যরসের রঙ যোগ করে।

অনুষ্ঠানে তাঁর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের কথাও স্মরণ করা হয়। নব্বইয়ের দশকে টানা তিন দিনে প্রতিদিন ১০টি করে মোট ৩০টি গান রেকর্ড করে তিনি এই বিশ্বরেকর্ড গড়েন। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই একটির পর একটি গান সম্পন্ন হতো—যা তাঁর পেশাদারিত্ব ও কণ্ঠের সক্ষমতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া রুনা লাইলের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তৎকালীন পাকিস্তানে। সরকারি কর্মকর্তা বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ এমদাদ আলীর কর্মস্থলের কারণে পরিবার নিয়ে তিনি রাজশাহী থেকে লাহোরে বসবাস করেন। সেখানে ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খান, আবদুল কাদের পিয়ারাং এবং পণ্ডিত গুলাম কাদেরের মতো গুণী শিক্ষকদের কাছে তিনি সংগীতের তালিম নেন। ১৯৬৫ সালে ‘জুগনু’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর প্লেব্যাক যাত্রা শুরু হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি প্রায় এক হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেন। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে এসে তিনি নিজের শিকড় ও আত্মপরিচয় নতুন করে আবিষ্কার করেন। বাংলা, উর্দু, হিন্দিসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়ে তিনি উপমহাদেশের সংগীতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান।

রুনা লাইলের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিষয়তথ্য
জন্ম১৭ নভেম্বর ১৯৫২, সিলেট
সংগীতজীবন শুরু১৯৬৫ সাল
রেকর্ডকৃত গানপ্রায় ১,০০০+
গাওয়া ভাষা২০টির বেশি
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার৮ বার
সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানস্বাধীনতা পুরস্কার
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড

বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে রুনা লাইল এক অনন্য নাম। তাঁর কণ্ঠে, সাধনায় ও ব্যক্তিত্বে মিশে আছে কয়েক দশকের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।