শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য ও শিশুশ্রম উদ্বেগজনক

দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের হার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার যথেষ্ট থাকলেও শিক্ষার্থীদের বড় অংশ মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে দেশের শিশু শ্রমের হার ২০১৯ সালে প্রায় ৬.৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৯.২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ২.৪ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি নির্দেশ করে।

আজ (সোমবার) রাজধানীর একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সংলাপে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। সংলাপের শীর্ষক ছিল “নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে আগামী দিনের শিক্ষা খাত: নতুন চিন্তা, নতুন কাঠামো ও নতুন পদক্ষেপ”। অনুষ্ঠানে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সংলাপটি পরিচালনা ও সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্‌দী আমিন। এছাড়া সংলাপে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধুরী।

তৌফিকুল ইসলাম প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তি নিশ্চিত হলেও শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাথমিক স্তরে ছেলেদের ভর্তির হার একসময় ৯৮ শতাংশে পৌঁছালেও ২০২৪ সালে তা ৯১ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে উত্তরণের হারও সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, গ্রামীণ এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক অবস্থার কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সেই উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

শিক্ষার ব্যয় ও সুযোগের বৈষম্য

সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে শিক্ষার ব্যয়ে বৈষম্য রয়েছে। মোট শিক্ষা ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি পরিবার নিজস্ব অর্থে বহন করছে। যদিও সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করে, বাস্তবে গাইড বই, কোচিং ও অতিরিক্ত শিক্ষাসামগ্রীর জন্য পরিবারগুলোকে নিয়মিত ব্যয় করতে হয়।

শিক্ষা পর্যায়শিক্ষার্থীর সংখ্যাভর্তির হার (%)উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ
প্রাথমিক10,500,00091মাঝপথে পড়াশোনা ছোঁড়া
মাধ্যমিক5,800,00075দরিদ্র পরিবার, গ্রামীণ এলাকা
উচ্চশিক্ষা1,200,00062শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি

অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধার সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য অবকাঠামোর অভাব, মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার অভাব উল্লেখযোগ্য।

উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব ও দক্ষতা ঘাটতি

উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৩.৫ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় বা ডিগ্রি অর্জন সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক ও মানসিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে, আধুনিক শ্রমবাজারে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে যদি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে রূপান্তর করা না হয়, তবে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব কমানো এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়বে।

শিশু শ্রমের বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, ব্যয় ও সুযোগের বৈষম্য দূর করা, এবং উচ্চশিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় আনা। শিক্ষার মান বৃদ্ধির মাধ্যমে শিশুশ্রম হ্রাস এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব।