ল্যাটিন আমেরিকায় ট্রাম্পের সমরনীতি: ভেনেজুয়েলা পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু কোন দেশ?

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মধ্যরাতে অতর্কিত বোমা হামলা এবং বিশেষ কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই দুঃসাহসী সামরিক পদক্ষেপ কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়, বরং এটি ‘মনরো ডকট্রিন’-এর এক চরমপন্থী সংস্করণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, পশ্চিম গোলার্ধে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে থাকতে পারবে না। মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক করে নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তুতি যখন চলছে, তখন আন্তর্জাতিক মহল এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ট্রাম্পের পরবর্তী ‘হিট লিস্ট’-এ কোন দেশগুলোর নাম রয়েছে।

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি পরিচালিত ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ ছিল ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফসল। তিনি এই অভিযানকে ‘টেলিভিশন শোর মতো রোমাঞ্চকর’ হিসেবে বর্ণনা করে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। তবে ভেনেজুয়েলার এই সংকট কেবল শুরু মাত্র। ট্রাম্পের ঘোষিত ‘ট্রাম্প করোলেরি’ বা নব্য মনরো নীতি অনুযায়ী, আমেরিকা অঞ্চলের যেকোনো বাহ্যিক প্রভাব বা মাদক সংশ্লিষ্টতাকে তিনি সরাসরি যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন। ইতিমধ্যেই তিনি মেক্সিকোর মাদক কার্টেলগুলোকে নির্মূল করতে সে দেশে ড্রোন হামলা ও বিশেষ বাহিনী পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন। একই সাথে কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন যে, অবৈধ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পালায় তাদের নামও রয়েছে।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। তিনি কেবল দক্ষিণ আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নন; বরং উত্তর মেরুর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার জন্য ডেনমার্কের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। একইভাবে, পানামা খালের ওপর মার্কিন কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নৌপথ নিজের মুঠোয় নিতে উন্মুখ। ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট যে, তিনি তথাকথিত ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

ট্রাম্পের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অভিযান ও কৌশলগত লক্ষ্য

লক্ষ্যবস্তু দেশ/অঞ্চলঅভিযানের মূল অজুহাতভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য
মেক্সিকোমাদক কার্টেল (নারকো-টেরর) নির্মূলউত্তর সীমান্তে অভিবাসন ও মাদক চোরাচালান বন্ধ করা
কিউবাএকনায়কতন্ত্র ও রুশ-চীন প্রভাবল্যাটিন আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক প্রভাব চিরতরে মুছে ফেলা
গ্রিনল্যান্ডচীন-রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির হুমকিআর্কটিক অঞ্চলের খনিজ সম্পদ ও সামরিক কৌশলগত সুবিধা
পানামা খালপানামা সরকারের সাথে চুক্তির লঙ্ঘনবৈশ্বিক শিপিং রুটের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও শুল্ক আদায়
কলম্বিয়ামাদক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাকোকা চাষ নির্মূল ও মার্কিন অনুগত শাসন নিশ্চিত করা

ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতি ল্যাটিন আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যেও চরম অস্বস্তি তৈরি করেছে।1 কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বা মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাম ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের এই ‘সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ’ রুখে দেওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ লুণ্ঠনের যে অভিপ্রায় ট্রাম্প প্রকাশ করেছেন, তা বিশ্ব তেল বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ট্রাম্প যখন দাবি করেন যে তিনি ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করবেন, তখন তা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়।2 ইতিহাসে দেখা গেছে, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া শাসনব্যবস্থা কখনোই টেকসই হয় না; বরং তা দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে। ট্রাম্পের এই ঝটিকা অভিযানের পরবর্তী শিকার কে হবে, তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

সুত্র:দ্য গার্ডিয়ান