লিবিয়া মডেল ইরানে অকার্যকর, খামেনি হত্যা বুমেরাং হতে পারে

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করে আসছিল যে, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের মতো শীর্ষ নেতার পতন ঘটলে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর গভীর বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা। খামেনিকে হত্যার এই কৌশল হিতে বিপরীত বা ‘বুমেরাং’ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি বনাম ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন

লিবিয়া বা ইরাকের মতো দেশগুলোতে শাসনব্যবস্থা ছিল মূলত এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেখানে নেতার পতন মানেই ছিল পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের অচল হয়ে পড়া। কিন্তু ইরানের ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ মডেলটি গড়ে উঠেছে একটি নিশ্ছিদ্র প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ওপর। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষক আলি হাশেমের মতে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এমন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন যেখানে ব্যক্তি গৌণ, কিন্তু ‘নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান’ বা ‘ভেলায়েত-এ-ফকিহ’ মুখ্য। ইরানের সংবিধানে ক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তির ওপর নিরঙ্কুশভাবে ন্যস্ত নয়, বরং তা বিভিন্ন শক্তিশালী কাউন্সিলের মধ্যে বণ্টিত।

নিচে ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর প্রধান স্তম্ভসমূহ এবং তাদের ভূমিকা তুলে ধরা হলো:

প্রতিষ্ঠানের নামপ্রধান ভূমিকা ও কার্যপরিধি
অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসসর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন, তদারকি এবং প্রয়োজনে অপসারণের ক্ষমতা রাখে।
গার্ডিয়ান কাউন্সিলসংবিধান ও ইসলামি আইনের সাথে সংগতি রেখে সংসদীয় আইন ও নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করে।
এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলসংসদ ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নীতি নির্ধারণে পরামর্শ দেয়।
আইআরজিসি (IRGC)দেশের অখণ্ডতা রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক হুমকি মোকাবিলায় প্রধান সামরিক শক্তি।
বিচার বিভাগদেশের আইন শৃঙ্খলা ও বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে কাজ করে।

সাংবিধানিক উত্তরাধিকার ও স্থিতিশীলতা

ইরানের সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু বা অক্ষমতায় ক্ষমতা শূন্য থাকে না। তাৎক্ষণিকভাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল (যাতে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগীয় প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের প্রতিনিধি থাকেন) দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর যেভাবে দ্রুততার সাথে নতুন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে ইরানের প্রশাসনিক কাঠামো যেকোনো আকস্মিক ধাক্কা সামলে নিতে সক্ষম। খামেনির মৃত্যুর পর এই প্রক্রিয়াটি আরও বেশি আবেগপ্রসূত ও সংবদ্ধ রূপ নিতে পারে।

আইআরজিসি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রভাব

নেতৃত্বের পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর’ বা আইআরজিসি। তারা কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং বিপ্লবের অতন্দ্র প্রহরী। কোনো শীর্ষ নেতার ‘শাহাদাত’ ইরানি জনগণের মধ্যে প্রতিশোধের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে এবং ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি করে। ইতিহাস বলে, বাহ্যিক আক্রমণ বা শীর্ষ নেতার হত্যাকাণ্ড ইরানি শাসকগোষ্ঠী ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিভেদ মিটিয়ে তাদের একীভূত করে তোলে। পশ্চিমা শক্তিগুলো যে বিশৃঙ্খলার আশা করছে, তা আসলে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হতে পারে।

উপসংহার: কেন লিবিয়া মডেল এখানে ব্যর্থ?

লিবিয়া বা সিরিয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্বের শূন্যতা গৃহযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল কারণ সেখানে কোনো শক্তিশালী বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। কিন্তু ইরানে ধর্মীয় শহর ‘কোম’ এবং সামরিক শক্তি ‘আইআরজিসি’-র মধ্যে এক ধরণের অলিখিত দর-কষাকষি ও ঐকমত্যের সংস্কৃতি বিদ্যমান। তারা জানে যে বিশৃঙ্খলা মানেই বিদেশি শক্তির আধিপত্য। ফলে খামেনির অনুপস্থিতি ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে দেশটিকে আরও দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর প্রতিরোধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মার্কিন ও ইসরায়েলি এই সামরিক পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেওয়ার বদলে সেটিকে আরও হার্ডলাইনার বা কট্টরপন্থী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।