২০২৫ সালটি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। এই এক বছরে দেশের ফুটবল যেমন পেয়েছে আন্তর্জাতিক সাফল্যের স্বাদ, তেমনি বিশ্ব ফুটবলেও ঘটেছে অবিশ্বাস্য সব পটপরিবর্তন। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের গ্যালারিতে ফেরার যে জোয়ার এই বছর দেখা গেছে, তা নিকট অতীতে বিরল।
বছরের শুরুটা অবশ্য কিছুটা নাটকীয় ছিল। জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলে এক নজিরবিহীন বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়। কোচ পিটার বাটলারের কঠোর নিয়মের বিরুদ্ধে অধিনায়ক সাবিনা খাতুন ও ঋতুপর্ণা চাকমাসহ ১৮ জন ফুটবলার অবস্থান নেন। যদিও পরবর্তীতে বাফুফের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়, তবে শৃঙ্খলার প্রশ্নে সংস্থাটি কঠোর অবস্থানে থাকে। এই ঘটনার রেশ ধরে পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে জাতীয় দলের বাইরে রেখেই বছরের পরবর্তী পরিকল্পনা সাজানো হয়। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে এই ঝড়ের প্রভাব পড়তে দেননি নারী ফুটবলাররা।
২০২৫ সালের ২ জুলাই বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের মূল আসরে খেলার টিকিট নিশ্চিত করে ইতিহাস গড়ে। এর ফলে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ এক লাফে ২৪ ধাপ এগিয়ে ১০৪ নম্বরে পৌঁছে যায়। একই ধারাবাহিকতায় লাওসে অনূর্ধ্ব-২০ নারী দলও এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয়। এই সাফল্যগুলো প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকাঠামো পেলে বাংলাদেশের নারী ফুটবল বৈশ্বিক মঞ্চে দাপট দেখাতে সক্ষম।
দেশের ফুটবলে সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি। ২৫ মার্চ যখন লেস্টার সিটির হামজা চৌধুরী বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সি গায়ে চড়ালেন, তখন দেশের ফুটবল উন্মাদনা অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। তার সাথে সমিত সোম ও কিউবা মিচেলদের মতো প্রতিভাবান ফুটবলারদের আগমনে জাতীয় দলের খেলায় পেশাদারিত্ব ও গতি বৃদ্ধি পায়। এর প্রতিফলন দেখা যায় ১৮ নভেম্বর, যখন দীর্ঘ ২২ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ভারত বধ করে বাংলাদেশ। শেখ মোরছালিনের দুর্দান্ত গোলে ১-০ ব্যবধানের সেই জয় ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে আনে।
| ২০২৫ সালের ফুটবল সাফল্যের বিশেষ অর্জন | বিস্তারিত বিবরণ |
| সবচেয়ে বড় চমক | হামজা চৌধুরীর জাতীয় দলে অভিষেক |
| ঐতিহাসিক জয় | ভারতের বিপক্ষে ১-০ গোলে জয় (১৮ বছর পর) |
| ঘরোয়া ফুটবলের রাজা | মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব (২৩ বছর পর লিগ জয়) |
| বিশ্বসেরা ফুটবলার | উসমান দেম্বেলে (ব্যালন ডি’অর বিজয়ী) |
| চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বিজয়ী | প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) |
| ইউরোপীয় ট্রফি খরা জয় | টটেনহাম (১৭ বছর পর ইউরোপা লিগ জয়) |
আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবলেও ২০২৫ সাল ছিল চমকের বছর। লুইস এনরিকের জাদুকরী কোচিংয়ে ফরাসি ক্লাব পিএসজি অবশেষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অভিশাপ কাটিয়েছে। ফাইনালে ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা প্রথম মহাদেশীয় শিরোপা ঘরে তোলে। অন্যদিকে, ইংলিশ ক্লাব টটেনহাম দীর্ঘ ১৭ বছর পর এবং ক্রিস্টাল প্যালেস ১১৯ বছর পর তাদের প্রথম বড় কোনো শিরোপা জিতে সমর্থকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। ব্যক্তিগত অর্জনে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন উসমান দেম্বেলে; চোটমুক্ত এক মৌসুমে অসাধারণ খেলে তিনি জিতে নিয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অর।
২০২৫ সালের এই অভাবনীয় প্রাপ্তিগুলো ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ফুটবল বিশ্বের পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। বাংলাদেশের ফুটবলারদের এই উত্থান দেশের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আগামী বিশ্বকাপে এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ কতদূর যেতে পারে, এখন সেই স্বপ্নই বুনছেন ফুটবল অনুরাগী জনতা।
