কুমিল্লার লাকসাম পৌর এলাকায় রাতের আঁধারে একটি শতবর্ষী পুকুর ভরাটের চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। গত রোববার সন্ধ্যায় শুরু হওয়া প্রাথমিক অভিযানের পর আজ সোমবার দুপুরে পুকুর ভরাটের জন্য ব্যবহৃত বালু ও মাটি প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ আইন অমান্য করে বিশাল এই জলাশয়টি ভরাট করায় স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও অবস্থান
লাকসাম-শ্রীয়াং সড়কের পশ্চিমগাঁও এলাকায় অবস্থিত এই জলাশয়টি স্থানীয়ভাবে ‘জোড়পুকুর’ নামে পরিচিত। একই এলাকায় পাশাপাশি দুটি বড় পুকুর থাকায় এই নামকরণ করা হয়েছে। ১ দশমিক ০৬ একর আয়তনের এই শতবর্ষী পুকুরটি দীর্ঘকাল ধরে এলাকার পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিত্যদিনের কাজেও এই পুকুরের পানি ব্যবহার করেন।
গত কয়েক দিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের অন্ধকারে ট্রাক ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে বালু ও মাটি ফেলে পুকুরটি ভরাটের কাজ চালিয়ে আসছিল। এলাকাবাসীর তথ্যমতে, পুকুরটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অংশ ইতিমধ্যে ভরাট করে ফেলা হয়েছিল।
প্রশাসনিক অভিযান ও নিলাম প্রক্রিয়া
গোপন সংবাদ পেয়ে গত রোববার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নার্গিস সুলতানা। অভিযান চলাকালে ভরাটকারীরা পালিয়ে গেলেও পুকুর ভরাটের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ বর্গফুট বালু ও মাটি জব্দ করা হয় এবং তা নিলামের ঘোষণা দেওয়া হয়।
আজ সোমবার দুপুরে লাকসাম উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে জব্দকৃত মাটির উন্মুক্ত নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন:
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিলন চাকমা।
উপজেলা প্রকৌশলী সাদিকুল জাহান (রিদান)।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আহমেদ উল্লাহ (সবুজ)।
লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী কামরুন্নাহার লাইলী।
নিলামে মোট চারজন অংশগ্রহণকারী অংশ নেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মিজানুর রহমান ২ লাখ ৭৪ হাজার টাকায় জব্দকৃত মাটি ও বালু কিনে নেন।
পুকুর ও নিলাম সংক্রান্ত তথ্যের সারসংক্ষেপ
| বিবরণ | তথ্য |
| পুকুরের নাম | জোড়পুকুর |
| অবস্থান | পশ্চিমগাঁও, লাকসাম-শ্রীয়াং সড়ক সংলগ্ন |
| পুকুরের আয়তন | ১.০৬ একর |
| ভরাটের পরিমাণ | প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ |
| জব্দকৃত বালু-মাটির পরিমাণ | ৪,১৪,৩৬০ বর্গফুট |
| নিলামের চূড়ান্ত মূল্য | ২,৭৪,০০০ টাকা |
| নিলামের তারিখ | সোমবার (আজ) |
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া
শতবর্ষী এই পুকুরটি রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে স্থানীয় বাসিন্দারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। ৬০ বছর বয়সী শামছুল আলম বলেন, এই পুকুরটি এলাকার পরিবেশের জন্য অপরিহার্য। এটি ভরাট হয়ে গেলে জনদুর্ভোগ বাড়ত। অপর এক তরুণ মানিক মিয়া জানান, গত কয়েক দিন ধরে রাতে ট্রাকের শব্দের কারণে মানুষ ঘুমাতে পারত না। প্রশাসন এই উদ্যোগ নেওয়ায় পুকুরটি রক্ষা পাওয়ার আশা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন, জড়িত ব্যক্তিদের যেন উপযুক্ত আইনগত শাস্তির আওতায় আনা হয়।
আইনি পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিলন চাকমা জানান, নিলামের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। এরপর ওয়ার্ক অর্ডারের মাধ্যমে পুকুর থেকে মাটি ও বালু দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে যাতে পুকুরটি তার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। তিনি আরও জানান, পুকুরের মালিকপক্ষকে খুব শীঘ্রই নোটিশ প্রদান করা হবে। তাঁদের বক্তব্য শোনার পর এবং ঘটনার তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা স্পষ্ট করেছেন যে, পরিবেশ রক্ষা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে জলাশয় ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় থাকবে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
