স্প্যানিশ ফুটবলে রেফারিং বিতর্ক এবার নতুন মোড় নিয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের সম্প্রচারনীতিকে নাৎসি জার্মানির প্রচারকৌশলের সঙ্গে তুলনা করে শাস্তির মুখে পড়তে পারেন লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস। তার মন্তব্য ঘিরে স্পেনের ফুটবল অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি এখন দেশটির ক্রীড়া ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত গড়িয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই লা লিগার রেফারিদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে রিয়াল মাদ্রিদ। বিশেষ করে নিজেদের আনুষ্ঠানিক টেলিভিশন চ্যানেলে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রচার করছে স্প্যানিশ ক্লাবটি। রেফারিংয়ের নিরপেক্ষতা নিয়েও একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছে তারা।
রিয়ালের এমন অবস্থানের প্রকাশ্য সমালোচনা করে আসছেন লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস। তবে এবার সেই সমালোচনা করতে গিয়ে এমন এক ঐতিহাসিক তুলনা টেনেছেন, যা তাকে শাস্তির ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত গত ১৬ অক্টোবর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ৬৪ বছর বয়সী তেবাস রিয়াল মাদ্রিদের প্রচারকৌশল নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ক্লাবটি নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠার জন্য পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় সামনে আনে এবং বারবার একই ধরনের অভিযোগ প্রচার করে।
তেবাস লেখেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদের নিজস্ব একদল মুখপাত্র রয়েছে এবং ক্লাবটি নিজেই এর নেতৃত্ব দেয়। তাদের কৌশল সবসময় একই—সুবিধাজনক পদক্ষেপ বাছা, অপমানের পুনরাবৃত্তি, সন্দেহ তৈরি করা ও শত্রুদের নাম প্রকাশ করা।’
এরপরই তিনি রিয়ালের এই কৌশলকে নাৎসি জার্মানির প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলসের ব্যবহৃত প্রচারপদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করেন। তার এই মন্তব্য দ্রুত বিতর্কের জন্ম দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি সরকারের প্রচারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন গোয়েবলস। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনমত প্রভাবিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণা পরিচালনায় তার ভূমিকা ইতিহাসে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। এমন একজন ব্যক্তির প্রচারকৌশলের সঙ্গে একটি ফুটবল ক্লাবের কার্যক্রমের তুলনা করায় তেবাসের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লা লিগা সভাপতির মন্তব্যের পর কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় রিয়াল মাদ্রিদ। ক্লাবটি তার বক্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে অবিলম্বে সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের দাবি জানায়।
বিতর্ক এখানেই থেমে থাকেনি। স্পেনের ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিল (সিএসডি) বিষয়টি দেশটির স্পোর্টস ট্রাইব্যুনালে (টিএডি) পাঠিয়েছে। তেবাসের মন্তব্য ক্রীড়াঙ্গনের মর্যাদা, শালীনতা ও আচরণসংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘন করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ট্রাইব্যুনালের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
সিএসডির মতে, তেবাসের আচরণ স্পেনের ক্রীড়া আইন ১০/১৯৯০-এর ৭৬.৪.বি অনুচ্ছেদের আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা, অর্থদণ্ড কিংবা সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
তবে অভিযোগ ওঠার অর্থ এই নয় যে লা লিগা সভাপতি ইতোমধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বিষয়টির আইনি মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য শাস্তির প্রশ্ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে নিজের বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তেবাস। পাল্টা বিবৃতিতে তিনি দাবি করেছেন, রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থক কিংবা ক্লাবটির মূল্যবোধকে অপমান করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। মূলত একটি নির্দিষ্ট প্রচারকৌশল ব্যাখ্যা করতেই তিনি ঐতিহাসিক উপমাটি ব্যবহার করেছেন।
একই সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের আনুষ্ঠানিক টেলিভিশন চ্যানেলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন লা লিগা সভাপতি। তার অভিযোগ, ক্লাবটির সম্প্রচারে স্প্যানিশ ফুটবলের রেফারিং ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এমনকি লিগের প্রতিযোগিতা নিয়ে কারসাজির অভিযোগও তোলা হচ্ছে।
তেবাসের প্রশ্ন, রিয়ালের আনুষ্ঠানিক টেলিভিশন চ্যানেল যখন রেফারিং ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে এবং লিগ চুরি হওয়ার অভিযোগ তোলে, তখন ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কিংবা সিএসডি নীরব থাকে কেন?
তিনি আরও জানতে চান, একটি প্রতিযোগিতাকে জালিয়াতিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করা কি খেলাধুলার শালীনতা ও মর্যাদার পরিপন্থী নয়? এ ধরনের অভিযোগে ক্লাব, রেফারি এবং লাখ লাখ ফুটবল সমর্থকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
লা লিগা সভাপতির বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি শুধু নিজের মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না; বরং রিয়াল মাদ্রিদের সম্প্রচার কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের সমান নজরদারি প্রত্যাশা করছেন।
স্প্যানিশ ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগা কর্তৃপক্ষের মতবিরোধ নতুন নয়। রেফারিংয়ের মান, প্রতিযোগিতা পরিচালনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন রয়েছে। তবে এবারের বিরোধ সরাসরি ক্রীড়াঙ্গনের আচরণবিধি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
এখন স্পেনের স্পোর্টস ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের। তেবাসের মন্তব্য আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য কি না, সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বিতর্কটি কেবল পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি লা লিগা সভাপতির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









