দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা দেওয়ায় অর্থনীতিতে স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে বর্তমানে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এই অগ্রগতি দেশের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকা, রপ্তানি আয়ে ধীরে ধীরে উন্নতি এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য বজায় রাখার ফলে রিজার্ভে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে বাজারে হস্তক্ষেপসহ প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী, ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্রস বা মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৫৭৩ দশমিক ৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতি অনুসারে একই সময়ে রিজার্ভের পরিমাণ ২৭ হাজার ৮৭৫ দশমিক ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর আগের দিন, অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩২ হাজার ৪৮২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৮১৭ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মাত্র এক দিনের ব্যবধানে এই প্রবৃদ্ধি হলেও এটি সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনার একটি ইতিবাচক প্রতিফলন। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ফলে রিজার্ভে চাপ কিছুটা কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ রিজার্ভ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে রপ্তানি খাতের আয় ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হওয়াও এই অগ্রগতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক আর্থিক নীতি, বাজারে ডলারের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং খাতের নজরদারি রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।
উল্লেখ্য, নিট বা প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নির্ধারণ করা হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ মানদণ্ড অনুযায়ী। এই পদ্ধতিতে মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি এবং অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিয়ে প্রকৃত রিজার্ভ নির্ণয় করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সাধারণত এই নিট রিজার্ভকেই একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সক্ষমতার প্রকৃত সূচক হিসেবে বিবেচনা করে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের আশাবাদ, রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আমদানি ব্যয় নির্বাহ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বৈদেশিক মুদ্রার এই রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
