ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ীর দুই আসন—রাজবাড়ী-১ ও রাজবাড়ী-2—এ বিএনপির প্রার্থীদের বিজয় জেলার রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাজবাড়ী-১ আসনে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং রাজবাড়ী-২ আসনে হারুন অর রশীদ হারুনের জয়কে কেন্দ্র করে উন্নয়ন-প্রত্যাশা তুঙ্গে। তবে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশ্নটি স্পষ্ট: এই যুগপৎ নেতৃত্ব কি রাজবাড়ীকে নদীকেন্দ্রিক আঞ্চলিক অর্থনীতি থেকে জাতীয় প্রবৃদ্ধির কার্যকর ইঞ্জিনে রূপান্তর করতে পারবে?
ভৌগোলিক কৌশলগত গুরুত্ব
রাজবাড়ীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার অবস্থান। পদ্মা নদীসংলগ্ন এই জেলা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের সংযোগস্থল। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট দেশের অন্যতম ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ করিডোর, যার মাধ্যমে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন পারাপার হয়। এই করিডোর আধুনিকায়ন করা গেলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে, যা কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে।
নদীশাসন, সেচ ও নৌ-লজিস্টিকসের সমন্বিত উন্নয়ন হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। এতে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে, অপচয় কমবে এবং উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। অর্থনীতিতে এর বহুগুণ প্রভাব (মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট) সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নদীভাঙন: ব্যয় ও সম্ভাবনার সমীকরণ
পদ্মা অববাহিকায় মৌসুমি ভাঙন রাজবাড়ীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। প্রতি বছর বসতভিটা, কৃষিজমি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুনর্বাসন ও ত্রাণে সরকারের বড় অঙ্কের ব্যয় হয়। কিন্তু সমন্বিত নদীশাসন—ড্রেজিং, স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ, সেচ অবকাঠামো—দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় হ্রাস করতে পারে।
নিচে সম্ভাব্য প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো:
| খাত | বর্তমান চ্যালেঞ্জ | সম্ভাব্য সুফল |
|---|---|---|
| নদীভাঙন | জমি ও ঘরবাড়ি ক্ষতি | চাষযোগ্য জমি সংরক্ষণ |
| সেচব্যবস্থা | মৌসুমি অনিশ্চয়তা | উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি |
| লজিস্টিকস | সময় ও ব্যয় বেশি | পরিবহন দক্ষতা বৃদ্ধি |
| কর্মসংস্থান | সীমিত শিল্পায়ন | শিল্পপার্কে দীর্ঘমেয়াদি চাকরি |
তবে বাস্তবতা হলো—পরিবেশগত সমীক্ষা (EIA), পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ছাড়া বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন জটিল। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ধারাবাহিকতা না থাকলে উদ্যোগ মাঝপথে থেমে যেতে পারে।
অবকাঠামো-নির্ভর কর্মসংস্থান মডেল
গবেষণা বলছে, অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১ টাকা ব্যয়ে ১.৫–২ টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে। বড় সেতু, নৌবন্দর, লজিস্টিক হাব বা শিল্পপার্ক স্থাপন করলে স্বল্পমেয়াদে নির্মাণখাতে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও সেবা খাতে স্থায়ী চাকরি তৈরি হয়।
তবে শর্ত তিনটি—দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণপ্রাপ্তি, এবং স্থানীয় শ্রমশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি। এসব নিশ্চিত না হলে বহিরাগত শ্রমশক্তি সুবিধা পাবে, স্থানীয় তরুণরা নয়।
যুগপৎ নেতৃত্বের সমন্বয়
একই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে দুই আসনের প্রতিনিধিত্ব উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমন্বয় বাড়াতে পারে। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ আদায়ে যৌথ কৌশল কার্যকর হতে পারে এবং প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পেতে পারে। তবে দলীয় ঐক্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নাও নিতে পারে। রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও আর্থিক বাস্তবতার ভারসাম্য রক্ষা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান
রাজবাড়ীকেন্দ্রিক নদীশাসন ও লজিস্টিক আধুনিকায়ন সফল হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানীসহ বড় বাজারে পৌঁছাবে। পরিবহন সময় ও ব্যয় কমলে জাতীয় সরবরাহ শৃঙ্খলা আরও কার্যকর হবে। ক্ষুদ্র শিল্প ও সেবা খাতে নতুন বিনিয়োগ এলে জিডিপিতে আঞ্চলিক অবদান বাড়বে।
সবশেষে বলা যায়, প্রতিশ্রুতি থেকে নীতি, নীতি থেকে প্রকল্প এবং প্রকল্প থেকে দৃশ্যমান ফলাফলে পৌঁছাতে পারলেই রাজবাড়ী একটি কার্যকর আঞ্চলিক উন্নয়ন মডেলে পরিণত হতে পারে। মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট—নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, যুব কর্মসংস্থান ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা। এই চার স্তম্ভে টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত হলেই রাজবাড়ী জাতীয় প্রবৃদ্ধির নতুন মানচিত্র আঁকতে সক্ষম হবে।
