যুদ্ধবিরতিতেও ইরানের অর্থনৈতিক সংকট গভীরতর

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলায় সাময়িক বিরতি এলেও ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থায় কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতির পর কিছু মানুষ কাজে ফিরলেও সার্বিক বাজার, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সাধারণ জীবনযাত্রায় গভীর অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতা বজায় রয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য আংশিকভাবে সচল হলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি।

তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে তুলনামূলকভাবে কিছু দোকান খুললেও ক্রেতার উপস্থিতি ও বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ব্যবসায়ীরা জানান, যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় বাজারে চাহিদা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশেষ করে ধাতব পণ্য, নির্মাণসামগ্রী ও শিল্পপণ্যের বিক্রয় প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পাইকারি বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে পণ্য আমদানি সম্ভব হবে কি না, কিংবা হলে কোন দামে হবে—এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্যপ্রবাহে সংকট

যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর থেকে আবারও প্রায় সম্পূর্ণভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে ইন্টারনেট সেবা। এতে বহু মানুষ তাদের জীবিকার উৎস হারিয়েছেন। শিক্ষা, ফ্রিল্যান্স কাজ, এবং বিভিন্ন সেবাভিত্তিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের বহু পরিবার আয়ের একমাত্র মাধ্যম হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।

তেহরানের এক শিক্ষক জানান, তিনি আগে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভিডিও যোগাযোগের মাধ্যমে পাঠদান করতেন। বর্তমানে সীমিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, ফলে তার আয়ের বড় অংশ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে পরিচালিত সেবা ব্যবস্থাগুলো কার্যকর হলেও সেগুলো সীমিত পরিসরে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ নেই।

অর্থনীতির ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান খাতসমূহ

ক্ষতিগ্রস্ত খাতপ্রভাবের ধরন
শিল্প উৎপাদনবড় কারখানা বন্ধ, উৎপাদন ব্যাহত
জ্বালানি খাততেল ও গ্যাস স্থাপনায় ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা
পরিবহন ব্যবস্থাবিমান ও রেল যোগাযোগে বিঘ্ন
তথ্য ও সেবা খাতআয়ের বড় অংশ বন্ধ, কর্মসংকোচন
বাণিজ্য খাতআমদানি-রপ্তানিতে স্থবিরতা

সরকারি পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা

সরকার সংকট মোকাবিলায় কিছু নির্বাচিত খাতকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ও সেবা খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানকে ঋণ সুবিধা ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সহায়তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখনো পরিষ্কার নয়।

এছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন ধরনের সীমিত সেবা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে ব্যবহারকারীর ধরন অনুযায়ী আলাদা সংযোগ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রিত তথ্য ব্যবস্থারই সম্প্রসারিত রূপ হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি

অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগবে। ইতিমধ্যে দেশটি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বাজেট ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। নতুন করে অবকাঠামোগত ক্ষতি ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম খাতেও ব্যাপক কর্মসংকোচন দেখা দিয়েছে। অনেকেই ব্যক্তিগত সঞ্চয় ব্যবহার করে জীবনযাপন করছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সম্পদ বিক্রি করছেন।

সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতি ইরানের জন্য স্বস্তি নয়, বরং একটি সাময়িক বিরতির মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ এখনো অনেক দূরের বিষয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।