যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিনি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিনি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ভারত থেকে সব চেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে থাকে। প্রতিবছর প্রায় দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে থাকে বাংলাদেশ। ভারত সরকার নিজেদের বাজারে চিনি দাম নিয়ন্ত্রণ রাখায় রপ্তানির লাগাম টেনেছে গতবছর। এতে করে দেশটিতে কম দাম থাকলে বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে চিনি না নিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিনি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চিনির দাম বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। এর মধ্যে ভারতের কলকাতায় ৪৪ টাকা, নেপালের কাঠমান্ডুতে ৮২ টাকা, পাকিস্তানের করাচিতে ৫৮ টাকা এবং শ্রীলঙ্কা কলম্বো ৮৮ টাকা। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চিনি উৎপাদনকারী দেশ ভারত রপ্তানিতেও দ্বিতীয়। রপ্তানিতে শীর্ষে থাকা ব্রাজিলেও এবার উৎপাদন কম হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিনি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিনি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ

জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) গত গত ১৭ মার্চ দরপত্র উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে। এতে দুটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান অংশ গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একসেনচ্যুয়েট টেকনোলজি ইনকরপোরেশন (স্থানীয় এজেন্ট : ওএমসি লিমিটেড, ঢাকা) ব্রাজিলের চিনি প্রতি টনের দাম ৪৯৫.৫০ ডলার এবং অপর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্টার মেট্রিক্স প্রাইভেট লিমিটেড প্রতি টনের দাম ৪৯৫.৮০ ডলার উল্লেখ করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাকসেনচ্যুয়েট টেকনোলজি ইনকরপোরেশনের দরপত্রে টনপ্রতি ৩০ সেন্ট কম দাম রাখায় তাদেরকে দেয়া হয়।

বুধবার ক্রয় সংক্রান্ত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানানো হয়, প্রতি টন ৪৯৫.৫০ মার্কিন ডলার হিসাবে চিনি আমদানি করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে টিসিবির জন্য ১২ হাজার ৫০০ টন চিনি আমদানি করবে সরকার। প্রতি কেজির মূল্য পড়বে দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৮২.৮৪ টাকা। এতে মোট ব্যয় হবে ৬৬ কোটি টাকা।

জানা যায়, নয়াদিল্লিতে গতবছর ২২-২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও ডাল আমদানিতে বার্ষিক কোটা চেয়েছে বাংলাদেশ। কোটা পাওয়া গেলে ভারত যখন-তখন বাংলাদেশে এসব পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারবে না।

বৈঠক শেষে দেশে ফিরে গতবছর ২৭ ডিসেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছিলেন, ভারত হঠাৎ করে পেঁয়াজ ও গম রপ্তানি বন্ধ করায় মধ্যে সমস্যা হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের প্রধান সরবরাহকারী দেশ ভারতের কাছে তাই এসব পণ্য আমদানিতে বার্ষিক কোটা-সুবিধা চাওয়া হয়েছে। আমরা যা চেয়েছি, তা তারা দিতে পারবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু আমরা যদি পরে তা আমদানি না করি, তখন কী হবে, এমন প্রশ্ন করেছে তারা।

বাংলাদেশের খুচরা বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) ব্যবসায়ীদের মুনাফাসহ হিসাব করে এর আগে চিনির দর ১০৪ থেকে ১০৯ টাকা হওয়া উচিত বলে সুপারিশ করেছিল। তবে তা কার্যকর না হয়ে বাজারে তখন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রি হচ্ছিল।

 

যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিনি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ

 

ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে বিটিটিসি আবার সুপারিশ করে যে চিনির খুচরা দর হতে পারে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা কেজি। এ সুপারিশও ব্যবসায়ীরা মেনে নেননি।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গতকাল মঙ্গলবার এক সেমিনারের শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী বেশি দরে চিনি বিক্রি করছেন। দেশে যে বেশি দরে চিনি বিক্রি হচ্ছে, ক্রয় কমিটির কয়েকটি বৈঠকেই তার প্রমাণ রয়েছে। যেমন তুরস্ক থেকে দুই সপ্তাহ আগেই ৮৩ টাকা কেজি দরে চিনি কেনার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এক মাস আগে মালয়েশিয়া থেকে ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা ও ৮৮ টাকা ৭৪ পয়সা কেজি দরে চিনি কেনার দুটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ক্রয় কমিটিতে চিনির যত প্রস্তাব পাস হয়েছে, এর কোনোটিতেই কেজি প্রতি দর ৯০ টাকার বেশি ছিল না। এমনকি গত ১১ জানুয়ারি ভারতের কলকাতার শ্রীনোভা ইস্পাত প্রাইভেট লিমিটেড থেকে কেনা চিনির দাম পড়েছিল প্রতি কেজি ৫৬ টাকা ২২ পয়সা।

চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, চিনি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, ভ্যাট ও জাহাজভাড়া ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করলে দেশের বাজারে প্রতি কেজিতে দাম আরও ৩০ টাকার বেশি বাড়বে।

এদিকে বিটিটিসির হিসাবে, দেশে বছরে চিনির চাহিদা ১৮ থেকে ২০ লাখ টন। চিনির প্রায় পুরোটা বিদেশ থেকে আমদানি করে পরিশোধন এবং বাজারজাত করা হয়। এর বাইরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন উৎপাদন করে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন চিনি।

Leave a Comment