যুক্তরাষ্ট্র এখন রাশিয়ার তেল চায়

রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। শনিবার (১৪ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, কয়েক মাস আগেও রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করতে ভারতকে কঠোর চাপ দিয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এখন সেই একই তেল কেনার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছে।

আরাঘচির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে সতর্ক করে আসছিল যাতে দেশটি রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ করে। তার দাবি, ওয়াশিংটন এমনকি এ বিষয়ে ভারতকে প্রকাশ্যে সমালোচনাও করেছে। তবে ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।

তিনি বলেন, “মাসের পর মাস ভারতকে ধমক দিয়ে রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করতে বলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের সংঘাতের পর এখন হোয়াইট হাউস ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে সেই একই রাশিয়ার তেল কেনার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে।”

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউরোপীয় দেশগুলোকেও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তার মতে, ইউরোপ ভেবেছিল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন দিলে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আরও শক্তভাবে পাবে। তবে তিনি এই কৌশলকে “দুঃখজনক ও বিভ্রান্তিকর” বলে আখ্যা দেন।

প্রসঙ্গত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে কড়া অবস্থান নেন। তিনি দাবি করেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করছে। তার মতে, সেই অর্থ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়ার তেল আমদানি কমাতে চাপ দেয়। এমনকি ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের মতো কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হয়। পরে অবশ্য সেই শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয় ওয়াশিংটন। হোয়াইট হাউস তখন দাবি করে, ভারত ধীরে ধীরে রাশিয়ার তেল আমদানি কমাচ্ছে।

অন্যদিকে ভারত সরকার শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে, তাদের জ্বালানি নীতি সম্পূর্ণভাবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো প্রশ্ন নেই বলেও বারবার জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

তবে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ঘোষণার পর। ওই দিন তেহরান ঘোষণা দেয় যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হতে পারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই ঘোষণায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র উদ্বেগ দেখা দেয়।

বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় তেলের দামও অস্থির হয়ে ওঠে।

বিষয়তথ্য
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ববৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০% এই পথে যায়
প্রধান তেল আমদানিকারক দেশভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া
রাশিয়ার তেলের বড় ক্রেতাভারত ও চীন
উত্তেজনার সময়২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে “দ্বৈত মানদণ্ডের উদাহরণ” বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক অবস্থান বদলালেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি নীতির দিকনির্দেশনাও দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতির বাস্তবতাকেই নতুনভাবে সামনে এনে দিচ্ছে।