যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তদের অভিবাসন ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং আইনগতভাবে সংবেদনশীল। সাধারণত রাজনৈতিক আশ্রয় মঞ্জুর হলে প্রথম পাঁচ বছরের জন্য সুরক্ষাভিত্তিক থাকার অনুমতি দেওয়া হয়, যা মূলত “রিফিউজি স্ট্যাটাস” হিসেবে পরিচিত। এই সময়ের মধ্যে আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে বসবাস, কাজ ও সীমিত সামাজিক সুবিধা ভোগের সুযোগ পান। পাঁচ বছর পূর্ণ হলে শর্তসাপেক্ষে তাকে ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর)’ দেওয়া হয়, যা স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি।
আইএলআর পাওয়ার পর নাগরিকত্বের পথে আরও একটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আইএলআর মঞ্জুরের কমপক্ষে ১২ মাস পর একজন ব্যক্তি ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। এই আবেদন গ্রহণযোগ্য হলে তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্ট লাভ করেন, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তুলনামূলকভাবে অবাধ ভ্রমণের সুযোগ তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের সীমাবদ্ধতা অনেকটাই শেষ হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যুক্তরাজ্যে অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি ২০০৮ সালে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যান এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত হন। বর্তমানে তার দেশে ফেরার বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনি উভয় দিক থেকেই আলোচনায় থাকলেও, তা কীভাবে এবং কবে বাস্তবায়িত হবে—এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাজনৈতিক আশ্রয় মূলত নিজ দেশে নিরাপত্তাহীনতার স্বীকৃতি। কোনো আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যান, তাহলে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস ধারণা করতে পারে যে তার আর নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি নেই। এতে করে রিফিউজি স্ট্যাটাস বাতিল হওয়ার পাশাপাশি আইএলআরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ দেশে ফেরা শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি অভিবাসন আইনের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদক্ষেপ।
সাধারণ আইএলআরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, কেউ যদি টানা দুই বছরের বেশি সময় যুক্তরাজ্যের বাইরে অবস্থান করেন, তাহলে তার আইএলআর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে ফিরতে হলে নতুন করে ভিসার আবেদন করতে হয়, যা অনিশ্চিত ও জটিল প্রক্রিয়া।
রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তদের ভ্রমণের জন্য সাধারণ পাসপোর্টের পরিবর্তে ‘রিফিউজি ট্রাভেল ডকুমেন্ট’ দেওয়া হয়। এই নথি ব্যবহার করে তারা নিজ দেশ ছাড়া অন্য দেশে ভ্রমণ করতে পারেন। তবে আশ্রয়প্রাপ্ত কোনো বাংলাদেশি যদি বাংলাদেশে ফিরতে চান, তাহলে তাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বা সরকারের বিশেষ ভ্রমণ পারমিট ব্যবহার করতে হয়। এই পদক্ষেপ হোম অফিসের কাছে আশ্রয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে এবং আইনি ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে হোম অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করতে হয়। আবেদন অনুমোদিত হলে একটি প্রমাণপত্র ইস্যু করা হয়। তবে নাগরিকত্ব ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাজ্যে বসবাসের অধিকার শেষ হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে দেশটিতে থাকতে হলে নতুন ভিসা নিতে হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটি সহজভাবে বোঝাতে নিচের সারণিতে ধাপগুলো তুলে ধরা হলো—
| ধাপ | সময়কাল | মূল অধিকার ও ঝুঁকি |
|---|---|---|
| রাজনৈতিক আশ্রয় (রিফিউজি স্ট্যাটাস) | প্রথম ৫ বছর | সুরক্ষাভিত্তিক বসবাস, নিজ দেশে ফেরা ঝুঁকিপূর্ণ |
| আইএলআর | ৫ বছর পর | স্থায়ী বসবাস, ২ বছর বাইরে থাকলে বাতিল হতে পারে |
| নাগরিকত্ব আবেদন | আইএলআর-এর ১২ মাস পর | ব্রিটিশ পাসপোর্ট, পূর্ণ নাগরিক অধিকার |
| রিফিউজি ট্রাভেল ডকুমেন্ট | আশ্রয়কালীন | নিজ দেশ ছাড়া ভ্রমণ বৈধ |
| নাগরিকত্ব ত্যাগ | যে কোনো সময় | যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার বিলুপ্ত |
