আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হলে একদিকে যেমন সংস্কার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে না, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয় এবং জনগণের অংশগ্রহণ আরও উৎসবমুখর করা সম্ভব হবে। এই ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের বিষয়ে জনমত নেওয়ার পথকে আরও স্পষ্ট করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের মতো গণভোটও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একইদিনে অনুষ্ঠিত হবে, যাতে সংস্কারের লক্ষ্য কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়। এতে নির্বাচন আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে।” তিনি আরও জানান, গণভোট আয়োজনের জন্য উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে, যাতে পুরো প্রক্রিয়া সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন হয়।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে স্পষ্ট করা হয় যে, এই গণভোটের মূল ভিত্তি হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এই সনদের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং নাগরিক অধিকারের পরিসর সম্প্রসারণের বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হবে। সরকার মনে করছে, এ ধরনের গণভোট রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
জুলাই সনদ অনুসারে গণভোটের ব্যালটে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রথমত, নির্বাচকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন ও কার্যপ্রণালি। দ্বিতীয়ত, দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। তৃতীয়ত, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণসহ মোট ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অন্যান্য কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি ব্যালটে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, গণভোটে যদি জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, তাহলে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। এই পরিষদ জাতীয় সংসদের সদস্যদের মতো দায়িত্ব পালন করবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করবে। পরিষদ গঠনের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সময়বদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আনা হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। একই সঙ্গে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যা ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকারের মতে, এতে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং সংসদীয় গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
এছাড়া ভাষণে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” এর মাধ্যমে জুলাই সনদকে কেবল নীতিগত দলিল নয়, বরং সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
